পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণীদের কথা বললে সাধারণত চিতার চাবুকগতি, গ্রেহাউন্ড কুকুরের দৌড় কিংবা রেসের মাঠের তেজি ঘোড়ার কথা মনে পড়ে। এতকাল ধারণা ছিল, তীব্রগতিতে ছুটে চলার জন্য প্রাণীর শরীর হালকা এবং পা চিকন ও সুগঠিত হওয়া প্রয়োজন, যেন বাতাসের বাধা সহজে এড়ানো যায়। তবে অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের শারীরিক গঠন ও কৌশলের ওপর করা সাম্প্রতিক এক গবেষণা এ ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
গতির নতুন রেকর্ড: হান্টসম্যান মাকড়সা
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের উষ্ণ অঞ্চলের এক বিশেষ প্রজাতির হান্টসম্যান মাকড়সা গতির নতুন রেকর্ড গড়েছে। প্রতি সেকেন্ডে ৩.৫৯ মিটার সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে এটি পৃথিবীর অন্য সব মাকড়সা প্রজাতিকে ছাড়িয়ে গেছে। সহজ ভাষায়, ছোট বনের এ শিকারি মাকড়সাকে যদি মানুষের আকারে বড় করা হতো, তাহলে এটি শহরতলির রাস্তায় চলমান যেকোনো গাড়িকে অনায়াসে অতিক্রম করতে পারত।
মাকড়সার অনন্য চালন ব্যবস্থা
স্তন্যপায়ী প্রাণীরা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করার জন্য অভ্যন্তরীণ কঙ্কালের পেশির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। কিন্তু মাকড়সারা এক অনন্য হাইব্রিড প্রপালশন বা চালন ব্যবস্থা ব্যবহার করে। তারা তাদের পা ভেতরের দিকে টানার জন্য সাধারণ পেশি ব্যবহার করলেও, পা বাইরের দিকে প্রসারিত করার জন্য শরীরের ভেতরের একধরনের হাইড্রোলিক তরল চাপের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, যে মাকড়সার পা যত চিকন ও হালকা, তাদের ভেতরের হাইড্রোলিক তরল তত দ্রুত চলাচল করবে এবং তারা তত দ্রুত দৌড়াতে পারবে। নতুন গবেষণায় হালকা পায়ের তত্ত্বটি সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল: লম্বা ও মজবুত পা
বিজ্ঞানীরা ১৩৯টি মাকড়সা পরিবারের মধ্যে ৬৪টি পরিবারের ২৫৮টি প্রজাতির দৌড়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ওজনের দিক থেকে ভারসাম্য বজায় রাখার পর সবচেয়ে ভালো দৌড়বিদ মাকড়সাগুলোর পা চিকন নয়, তারা তুলনামূলকভাবে বেশ লম্বা ও মজবুত। লম্বা পা এই ভারী হান্টসম্যান মাকড়সাকে প্রতিটি পদক্ষেপে অনেক বেশি দূরত্ব পার হতে সাহায্য করে এবং ওজনের পরও এটি চমৎকার লিভারেজ বা শক্তি জোগায়।
গতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ
এত উচ্চগতিতে ছুটে চলার সময় আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। কুইন্সল্যান্ডের হান্টসম্যান মাকড়সা যখন পূর্ণগতিতে দৌড়ায়, তখন কোনো বাধা বা দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া এড়াতে তার স্নায়ুতন্ত্রকে অবিশ্বাস্য গতিতে কাজ করতে হয়। বিষয়টি নিয়ে জার্নাল অব কমপারেটিভ ফিজিওলজি-তে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
দ্রুতগতির দৃষ্টিশক্তি
গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্রগতির এসব মাকড়সা সাধারণ জাল বোনা মাকড়সার মতো ধীরগতির এবং উচ্চ রেজোল্যুশনের দৃষ্টিশক্তির ওপর নির্ভর করে না। পরিবর্তে শিকারি মাকড়সাগুলোর চোখে বিশেষ ধরনের র্যাপিড রেসপন্স ফটোরিসেপ্টর বা দ্রুত সাড়াদানকারী আলোকসংবেদী কোষ তৈরি হয়েছে। এগুলো সূক্ষ্ম বিবরণের চেয়ে হঠাৎ ঘটে যাওয়া নড়াচড়া এবং চারপাশের স্থানিক পরিবর্তনকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। এদের চোখ মূলত একটি হাইস্পিড ক্যামেরার মতো কাজ করে, যা গতি না কমিয়েই নিখুঁতভাবে শিকার ধরতে বা পথ পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।
রোবোটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রভাব
প্রকৃতির এ অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার আধুনিক রোবোটিক ইঞ্জিনিয়ারদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। সাধারণত রোবটকে চটপটে করার জন্য এর ওজন যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করা হয়। তবে মাকড়সার এ গঠন প্রমাণ করেছে যে ভারী শরীর নিয়েও লম্বা ও মজবুত পা এবং উন্নত মোশন সেন্সিং দৃষ্টির মাধ্যমে একটি যন্ত্রকে অত্যন্ত চটপটে ও গতিশীল করা সম্ভব। আমাদের বাড়ির আঙিনায় ঘুরে বেড়ানো খুদে শিকারিটিই এখন বিজ্ঞানীদের গতির নতুন পাঠ শেখাচ্ছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



