নাসার এক্স-৫৯: শব্দের দেয়াল ভেঙেও নীরবে উড়বে যেই বিমান
নাসার এক্স-৫৯: শব্দের দেয়াল ভেঙেও নীরবে উড়বে যেই বিমান

কনকর্ড বিমানের কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন। শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে আকাশে ডানা মেলা সেই বিখ্যাত যাত্রীবাহী বিমানটি ২০০৩ সালে চিরতরে অবসরে চলে যায়। এর পেছনে মূল কারণ ছিল আকাশছোঁয়া রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং এর তৈরি করা প্রচণ্ড বিকট শব্দ। ১৯৭৬ সাল থেকে যাত্রী পরিবহন শুরু করা কনকর্ড যখন তার সর্বোচ্চ গতি অর্থাৎ ঘণ্টায় ১ হাজার ৩৫০ মাইল বেগে ছুটত, তখন নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে পৌঁছাতে সময় লাগত তিন ঘণ্টারও কম! কিন্তু মুশকিল হলো, শব্দের চেয়ে জোরে ছুটতে গিয়ে এটি এমন বিকট শব্দ তৈরি করত, যা মাটিতে থাকা মানুষের জন্য রীতিমতো বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই আক্ষেপ ঘোচাতেই নাসা প্রায় এক দশক ধরে এমন এক বিমান তৈরির কাজ করছিল, যা শব্দের চেয়ে দ্রুত ছুটবে, কিন্তু কোনো কান ফাটানো শব্দ তৈরি করবে না। অবশেষে সেই স্বপ্নের এক ধাপ কাছাকাছি পৌঁছেছে নাসা।

এক্স-৫৯-এর ঐতিহাসিক ফ্লাইট

নাসার পরীক্ষামূলক বিমান এক্স-৫৯ প্রথমবারের মতো সুপারসনিক বা শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে ওড়ার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়েছে। গত ৫ জুন, শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ডস এয়ারফোর্স বেস থেকে উড্ডয়ন করা এই বিমানটি টানা ৮১ মিনিট আকাশে ছিল। নাসার অভিজ্ঞ পাইলট জিম লেস এই ঐতিহাসিক ফ্লাইটে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেন। মাটি থেকে ৪৩ হাজার ৪০০ ফুট ওপরে বিমানটি সর্বোচ্চ ৭১৩ মাইল প্রতি ঘণ্টায় ছুটেছে।

সুপারসনিক গতির পেছনের বিজ্ঞান

সুপারসনিক কথাটার অর্থ আসলে কী? বিজ্ঞানের ভাষায় এটি বেশ আপেক্ষিক একটি ধারণা। কারণ, বাতাসের তাপমাত্রা ও চাপের ওপর নির্ভর করে শব্দের গতি পরিবর্তিত হয়। নির্দিষ্ট কোনো পরিবেশে শব্দের যে নিজস্ব গতি, তাকে বলা হয় ‘ম্যাক ১’। কোনো বস্তু যখন এই ম্যাক ১-এর চেয়ে বেশি গতিতে ছোটে, তখন তাকে সুপারসনিক বলা হয়। আর গতি যখন ম্যাক ৫ পার হয়ে যায়, তখন তাকে বলে হাইপারসনিক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কোনো বিমান যখন শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছোটে, তখন এটি বাতাসের চাপের একধরনের তরঙ্গ তৈরি করে। এই তরঙ্গগুলো বিমানের পেছনের দিকে গিয়ে একত্রিত হয়ে একটি কোণ আকৃতি ধারণ করে। বিমানটি যদি মাটির খুব কাছাকাছি দিয়ে এমন গতিতে উড়ে যায়, তবে সেই চাপের কোণটি সজোরে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। তখনই আমরা বাজ পড়ার মতো প্রচণ্ড ও বিকট শব্দ শুনতে পাই। একে বলা হয় সনিক বুম।

এক্স-৫৯-এর জাদুকরী নকশা

নাসার এক্স-৫৯ বিমানটি তৈরিই করা হয়েছে এই সনিক বুমকে ঠেকানোর জন্য। এর নকশার দিকে তাকালেই বুঝবেন এটি সাধারণ বিমানের চেয়ে আলাদা। বিমানের সামনের অংশ অনেক বেশি লম্বা। এই লম্বা অংশ মূলত বাতাসের শক ওয়েভের চাপগুলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়, যাতে সেগুলো একত্রিত হয়ে বড় কোনো কোণ তৈরি করতে না পারে। ফলে বিমানটি যখন শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছোটে, তখন নিচে কোনো বিকট সনিক বুম তৈরি হয় না। নাসা একে বলছে কোয়ায়েট সুপারসনিক থাম্প বা শান্ত সুপারসনিক মৃদু শব্দ। নাসা জানিয়েছে, এর শব্দটা অনেকটা দূর আকাশে হালকা মেঘ ডাকার মতো, অথবা ২০ ফুট দূর থেকে কোনো গাড়ির ভারী দরজা বন্ধ করার মতো। কান ফাটানো বা কাঁচ ভেঙে ফেলার মতো সেই ভয়ংকর আওয়াজ এতে একেবারেই নেই।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রথমবারের মতো আকাশে উড়েছিল এক্স-৫৯। এর মধ্যে এক ডজনেরও বেশি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট সম্পন্ন করেছে এটি। এখন যেহেতু এটি সফলভাবে সুপারসনিক গতি ছুঁয়ে ফেলেছে, তাই এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পরিধি আগামীতে আরও বাড়ানো হবে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দিনে বিমানটিকে ৬০ হাজার ফুট উঁচুতে এবং ঘণ্টায় ১ হাজার ২১৮ মাইল বা ম্যাক ১.৬ গতিতে ওড়ানো হবে। পাশাপাশি প্রকৌশলীদের আরও নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার জন্য এর চেয়ে কম গতির বেশ কিছু ফ্লাইটও পরিচালনা করা হবে।

বর্তমান ধাপের পরীক্ষাগুলো শেষ হলে নাসা তাদের দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করবে। এই ধাপে মূলত বিমানটির তৈরি করা শব্দের নিখুঁত পরিমাপ করা হবে। বিজ্ঞানীরা দেখবেন, বিমানটি কি সত্যিই সেই কাঙ্ক্ষিত মৃদু শব্দ তৈরি করছে, নাকি অন্যান্য উচ্চ গতির যানের মতো কোনো বিরক্তিকর শব্দ তৈরি করছে। আর একেবারে শেষ ধাপে গিয়ে বিমানটিকে লোকালয় বা জনবসতির ওপর দিয়ে ওড়ানো হবে। তখন নাসা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে জরিপ করে জানার চেষ্টা করবে, এই বিমানের শব্দ তাদের কোনো বিরক্তি বা সমস্যার কারণ হচ্ছে কি না।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে খুব শিগগিরই হয়তো আমরা এমন এক যুগের সাক্ষী হতে যাচ্ছি, যেখানে শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে বিশ্বভ্রমণ হবে একেবারে নিস্তব্ধ এবং শান্তিময়!