সুন্দরবনের ভেতরে দস্যুদের হামলার শিকার হওয়ার পরও ভারতের উদ্দেশে আবার যাত্রা শুরু করেছে কার্গো জাহাজ এমভি আব্দুল হাকিম-১। আজ সোমবার ভোর পাঁচটার দিকে খুলনার কয়রা উপজেলার আংটিহারা শুল্ক স্টেশন থেকে জাহাজটি ভারতের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
জাহাজের পুনরায় যাত্রা
বিষয়টি নিশ্চিত করে জাহাজটির ইনচার্জ মাস্টার মো. নুর নবী বলেন, ভারতীয় বন্দরে প্রবেশের অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা বিলম্ব না করে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
হামলার বিবরণ
গত শনিবার দুপুরে মংলা বন্দর থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয় জাহাজটি। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে সুন্দরবনের শিংয়েনালা এলাকায় পৌঁছালে একটি ট্রলারে করে আসা ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দস্যুদল উঠে পড়ে জাহাজটিতে।
ঘটনা প্রসঙ্গে নুর নবী জানান, দস্যুরা প্রথমে নিচতলায় থাকা কর্মীদের জিম্মি করে ফেলে। পরে তারা মাস্টার ব্রিজে ঢোকার চেষ্টা করে। তিনি দ্রুত ব্রিজের সব গেট বন্ধ করে দিলে দস্যুরা দরজায় ১৫–২০টি গুলি চালায়। ব্রিজে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে তারা মাস্টার কেবিনের তালা ভেঙে তাঁর ৫৯ হাজার টাকা নিয়ে গেছে বলে দাবি করেন। এ ছাড়া জাহাজের অন্য কর্মীদের কাছ থেকে সাতটি মুঠোফোন ও প্রায় ছয় হাজার টাকা লুট হয়েছে।
হামলার পুরো ঘটনা ১৪ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘটে জানিয়ে নুর নবী বলেন, পরে আশপাশে থাকা অন্য জাহাজগুলো কাছে চলে এলে দস্যুরা দ্রুত ট্রলারে নেমে সুন্দরবনের ভেতরে পালিয়ে গেছে। ঘটনার পর জাহাজটি শাকবাড়িয়া নদীর তীরে আংটিহারা শুল্ক স্টেশনের সামনে নোঙর করা হয়। গতকাল রোববার শুল্কসংক্রান্ত কাজ শেষ হলেও নিরাপত্তার কারণে সেদিন আর যাত্রা শুরু করা হয়নি।
নিরাপত্তা উদ্বেগ
নুর নবী বলেন, ‘ঘটনার পর আমাদের একজন স্টাফ তানভীর শেখ ভয় পেয়ে জাহাজ ছেড়ে চলে গেছে। তবে ভারতীয় পারমিটের মেয়াদ সীমিত। বেশি দেরি করলে নতুন করে অনুমতি নিতে সময় লাগতে পারে। তাই আজ ভোর পাঁচটায় আমরা আবার যাত্রা শুরু করেছি। আশা করছি, তিন দিনের মধ্যে কলকাতা বন্দরে পৌঁছাতে পারব।’
দস্যুদের হামলার ঘটনায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি বলেও জানান নুর নবী। তাঁর ভাষ্য, ‘আংটিহারা নৌ পুলিশ ফাঁড়িকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু আইনি ঝামেলায় যেতে চাইনি।’
স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য
আংটিহারা শুল্ক স্টেশনের ঘাটের মাঝি আলমগীর হোসেন বলেন, জাহাজটি নোঙর করার পর তিনি সেখানে গিয়ে গুলির চিহ্ন দেখেছেন। তাঁর দাবি, স্থানীয়ভাবে ‘ঝপঝপি নদী’ নামে পরিচিত এলাকাকে জাহাজের লোকজন শিংয়েনালা নদী বলছিলেন। সেখানেই ঘটনাটি ঘটেছে। আলমগীর বলেন, জাহাজের দোতলার মাস্টার ব্রিজের দরজা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। পাশের কাচের জানালাতেও গুলির ছিদ্র দেখা গেছে।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান আংটিহারা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে রাজি হননি।
নৌ প্রটোকল কমিটির বক্তব্য
বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকল কমিটির কার্যকরী সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, জাহাজটি খালি অবস্থায় ভারতে যাচ্ছিল। সেখান থেকে ফ্লাই অ্যাশ (সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল) নিয়ে দেশে ফেরার কথা আছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে।
কোস্টগার্ডের পদক্ষেপ
কোস্টগার্ড বলছে, ঘটনাটি তাদের জানাতে বিলম্ব হওয়ায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘কোন দস্যু বাহিনী এ হামলার সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছেন এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে।’
শিল্প উদ্বেগ
সুন্দরবনের নদীপথে এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ–ভারত রুটে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের মোংলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার মাস্টার। তিনি নৌযান ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।



