বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার ধনপোতা গ্রামে ১৯৯৪ সালে মাত্র দেড় টাকা পুঁজি ও একটি দা নিয়ে কাঠের কলম উৎপাদন শুরু করেন অশোক পাল ও অরুণ পাল দুই ভাই। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ 'মিথুন কুঠির শিল্প' নামে পরিচিত। বর্তমানে তাদের তৈরি কাঠের কলম দেশের বাজারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পৌঁছেছে।
উৎপাদন প্রক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে তাদের দুটি কারখানায় মাসে গড়ে প্রায় ৬ হাজার কলম উৎপাদিত হয়। পরিবারের ৭ থেকে ৮ জন সদস্য এই কাজে যুক্ত। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করে তারা উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। একটি কলম তৈরি করতে প্রায় ৩৬টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তবে প্রতি ১ হাজার কলমে প্রায় ২০০টি উৎপাদনজনিত ত্রুটির কারণে বাতিল হয়ে যায়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। অরুণ পাল জানান, কারিগরি উন্নত প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা পেলে এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বাজারজাতকরণ ও মূল্য বৈষম্য
মিথুন কুঠির শিল্পে বিভিন্ন ধরনের কাঠের কলম তৈরি হয়। পাইকারি পর্যায়ে প্রতিটি কলম ১৬ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। সাধারণ নকশাবিহীন কলমের পাশাপাশি কারুকাজ খচিত ডিজাইনের কলমও রয়েছে। তবে খুচরা বাজারে এসব কলম আরও বেশি দামে বিক্রি হয়। উৎপাদকদের অভিযোগ, তারা ন্যায্যমূল্য না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা এসব পণ্য ব্র্যান্ড ও শোরুমে পৌঁছে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। অশোক পাল বলেন, "বাজারে আমাদের কলমের ভালো চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া সত্ত্বেও পাইকারদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়। আমরা সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে না পারায় মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভ করছে।"
রপ্তানি সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা
ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের তৈরি কলম যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পৌঁছেছে এবং সেখানে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। তবে বিদেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশে কিছু ধরনের শিষের কালি জমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। উন্নত মানের কালি ও শিষ আমদানির জন্য বহু চেষ্টা করেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাননি বলে জানান অশোক পাল। তিনি সরাসরি বিদেশে রপ্তানির জন্য অনেক অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো সুযোগ পাননি।
ভারতের কলকাতার বিভিন্ন বিপণন, যাদবপুর ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের কাঠের কলমের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। অরুন পাল জানান, আগে সেখানে প্রচুর কলম বিক্রি হতো, কিন্তু বর্তমানে বর্ডারে আটকে যাচ্ছে। সরকারিভাবে সহজে পাঠানো গেলে দেশেরও ট্যাক্স বাড়বে।
সরকারি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা
ফকিরহাট কাজি আজহার আলি কলেজের শিক্ষক আবু সাঈদ মল্লিক বলেন, "মিথুন কুটির শিল্পের উৎপাদিত কলমগুলো প্লাস্টিকের বদলে কাঠ দিয়ে তৈরি, যা পরিবেশ বান্ধব। কলমগুলো দেখতে সুন্দর এবং লিখেও স্বাচ্ছন্দ লাগে।" তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফকিরহাটের ধনপোতার এই কাঠের কলম একদিন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি আরও বাড়াতে সক্ষম হবে।
ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, "কাঠের কলম একটি ব্যতিক্রমধর্মী কুটির শিল্প, যা আমাদের শেকড়ের ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়। আমি তাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করব। বিশেষ করে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলব।"



