প্রকৌশলীদের নীতিনির্ধারণে না আনলে উন্নয়ন ব্যয়বহুল ও অটেকসই হবে
প্রকৌশলীদের নীতিনির্ধারণে না আনলে উন্নয়ন ব্যয়বহুল

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন নিয়োগ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ‘বিষয়ভিত্তিক স্পেশালিস্ট’ নিয়োগ এখনো চোখে পড়ছে না। সরকারের ইশতেহারের ৭০ শতাংশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রকৌশলীর প্রয়োজন। বাংলাদেশের মোট উন্নয়ন বাজেটের ৭০-৭৫ শতাংশ অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, পানিসম্পদ ও শিল্প খাতে ব্যয় হয়। অথচ এই খাতগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বিষয়ভিত্তিক প্রকৌশলীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফাঁক তৈরি হচ্ছে।

প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট অ্যাসেসমেন্ট অনুসারে বাংলাদেশে গড় খরচ বৃদ্ধি ৩০ শতাংশ এবং গড় বিলম্ব ৩ বছর। এর অন্যতম কারণ প্রকল্প পরিকল্পনা, ডিজাইন ও বাস্তবায়নে টেকনিক্যাল ক্যাপাসিটির অভাব। আমলাতন্ত্র ‘জি হুজুর’ নীতি মেনে চলে, ফলে সরকারের সিদ্ধান্তের টেকনিক্যাল সমস্যা অনুধাবন না করে তৎক্ষণাৎ কাজ দেখানোতে যায়।

বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্পগুলোতে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়মিত ঘটনা; মূল কারণ টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষ জনবলের ঘাটতি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের রিপোর্টে দেখা গেছে, টেকনিক্যাল সামর্থ্যের কারণে প্রায় ৩৯ শতাংশ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা পড়ে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দৃষ্টান্ত: পদ্মা সেতু ও অন্যান্য প্রকল্প

পদ্মা সেতুতে মোট খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা, যেখানে প্রকৌশলীদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় শেষ দিকে প্রায় ৮-১০ শতাংশ সাশ্রয় হয়। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কিছু প্রকল্পে কারিগরি দক্ষতার অভাবে ১০-১৫ শতাংশ অর্থ অপচয় হয়। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিবছর ১৬-১৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় অলস প্ল্যান্টের জন্য। দক্ষ এনার্জি ইঞ্জিনিয়াররা প্ল্যানিংয়ে থাকলে এই ট্র্যাপ এড়ানো যেত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একটি দেশের উন্নয়ন ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাঁধেই পড়ে; কিন্তু এই ব্যর্থতার কারণ প্রায়ই রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাবে নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তিগত পরামর্শের অনুপস্থিতি। প্রকৌশলীরা যখন নীতিনির্ধারণে থাকেন না, তখন যত ভালো ইচ্ছাই থাকুক, ফলাফল হয় অসম্পূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং টেকসইহীন।

জনতুষ্টিবাদী প্রকল্প ও দুর্নীতি

ডোনার এজেন্সির সঙ্গে কাজ করার সুবাদে সরকারি আমলারা কীভাবে অপ্রয়োজনীয় কাজে ফান্ড চায়, তা দেখা গেছে। অনেক প্রকল্প জনতুষ্টিবাদী, যা দুর্নীতির জন্যই প্রস্তুত করা হয়। কুষ্টিয়ায় একটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প দেখেছিলাম—যে খাল ছিল, তা কেউ কখনো দেখেনি। বরিশাল, খুলনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে ২০১০-২০ সালের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হলেও ৬০ শতাংশের বেশি খালে নিয়মিত পানিপ্রবাহ নেই। কারণ, খননের আগে নদী ও খাল সংযোগ ও পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল না। এই ক্ষতির মূল্যমান প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।

সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব

নেদারল্যান্ডস তাদের ‘রুম ফর দ্য রিভার’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নদী ও খালকে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় এনেছে, যেখানে প্রকৌশল, পরিবেশ ও অর্থনীতি একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ফলে তারা বন্যানিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন এবং নগর-পরিকল্পনায় সফল হয়েছে। বাংলাদেশে একই ধরনের ইন্টেগ্রেটেড প্ল্যানিং ছাড়া খাল খনন প্রকল্প টেকসই ফল দিতে পারবে না। রাস্তা ও কালভার্ট দুই বছরেই নষ্ট হয়ে যায় কোয়ালিটি কন্ট্রোলে প্রকৌশলীদের জবাবদিহির অভাবে; ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এ তাদের কার্যকর ভূমিকা নেই।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান

সরকারি ফ্যাক্টরিগুলো চালু করার প্রকল্পে আমলারা বড় অঙ্কের বাজেট দেবেন আধুনিকীকরণের জন্য; কিন্তু অনেক কিছু অল্প রিপেয়ার এবং কিছু নতুন মেশিন দিয়ে চালু করা সম্ভব। বিসিআইসি, বিটিসি, বিএফডিসিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি লোকসানে চলছে। অথচ একই খাতে বেসরকারি উদ্যোগের মুনাফা ১৫-২০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ১৩৮ বিলিয়ন টাকা লোকসান করেছে। দক্ষ প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা ও অপারেশনাল অপটিমাইজেশন নিশ্চিত করা গেলে এই খাতগুলোতে ১০-১৫ শতাংশ ব্যয় কমানো এবং লাভজনক করা সম্ভব।

প্রযুক্তিগত উপদেষ্টার প্রয়োজন

অনেক দেশেই ‘প্রধান টেকনিক্যাল উপদেষ্টা’ এবং ‘প্রকৌশলী উপদেষ্টা কমিটি’ গঠন করে বড় প্রকল্পে স্বাধীন টেকনিক্যাল যাচাইবাছাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন ‘চিফ টেকনিক্যাল অফিসার’ এবং পরিকল্পনা কমিশনের অধীন একটি ইউনিট গঠন করা গেলে প্রকল্প অনুমোদনের আগেই টেকনিক্যাল সম্ভাব্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে। ভারতে ‘প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা’ পদ রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বড় প্রকল্পে টেকনিক্যাল রিভিউ কমিটি বাধ্যতামূলক। এ কারণে ভারতের জাতীয় হাইওয়ে নির্মাণ ব্যয় বাংলাদেশের তুলনায় প্রতি কিলোমিটারে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম। বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা, যেখানে ভিয়েতনামে ৬–৮ কোটি এবং ভারতে ৭-১০ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও স্মার্ট গ্রিডের যুগে ‘জেনারেলিস্ট’ দিয়ে দেশ চালানো প্রায় অসম্ভব। সরকারের ‘সাস্টেইনেবল ডেভলমেন্ট গোল’ অর্জনেও প্রকৌশলী প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রকৌশলীদের স্থান দিয়ে গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট একজন প্রকৌশলী; ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে ৬০-৭০ শতাংশ প্রকৌশলী ছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হি ছিলেন প্রকৌশলী। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ প্রকৌশলী না হলেও দেশের নীতিতে প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরে সরকারি প্রকল্পের ৯০ শতাংশের বেশি মূল্যায়ন প্রকৌশলীদের দ্বারা সম্পন্ন হয়।

জিয়াউর রহমানের উদাহরণ

জিয়াউর রহমান ট্রেনের বগির উৎপাদন দেশে করতে চেয়েছিলেন। আমলাতন্ত্র বোঝালেও তিনি একজন প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেন এবং তিনি সফলভাবে প্রকল্প নামিয়ে ফেলেন। এটি তৎকালীন আমদানি ব্যয়ের তুলনায় ৬০ শতাংশ সাশ্রয়ী ছিল; কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো ধারাবাহিকতা রাখেনি। ফলে আজ বাংলাদেশ বছরে হাজার কোটি টাকার রেলওয়ে সরঞ্জাম আমদানি করছে, যা দেশেই তৈরি হতে পারত। যদি প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে একজন প্রকৌশলী কমিশনার বা ডিরেক্টর থাকতেন, তবে বাস্তবায়ন ২০-২৫ শতাংশ দ্রুত হতো।

শিক্ষায় প্রকৌশলীর ভূমিকা

দেশে আগে শিক্ষক বলতে জ্ঞানী ও শ্রদ্ধার মানুষের চেহারা ভেসে উঠত; বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্বল সিলেবাস ও দুর্বল শিক্ষকরা দুরবস্থার জন্য দায়ী। সরকার কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত করার চিন্তা করছে। এখানে প্রকৌশলীদের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার এখনো ২০ শতাংশের নিচে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানিতে ৫০-৬০ শতাংশের বেশি। জার্মানির ডুয়েল ভোকেশনাল সিস্টেমে প্রকৌশলীরাই প্রশিক্ষণের মূল কাঠামো তৈরি করেন। প্রকৌশলীদের সরাসরি যুক্ত করে টিভেট সম্প্রসারণ করলে এই গ্যাপ দ্রুত কমানো সম্ভব; ভালো শিক্ষক এলে বিদেশি আর্থিক সহায়তাও পাওয়া যাবে।

প্রকৌশল সংস্কার কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবায়ন জরুরি

বাংলাদেশ যদি মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়াতে চায়, তাহলে টেকনিক্যাল গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক না করলে ব্যয় বাড়বে, কিন্তু ফল আসবে না। এখন সময় এসেছে ‘প্রকৌশলীনির্ভর বাস্তবায়ন’ মডেলে যাওয়ার। ২০০৯ সালে গঠিত প্রকৌশল সংস্কার কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবায়িত হলে অন্তত ১৫টি সুপারিশ বাস্তবায়িত হতে পারত, যার মধ্যে প্রকল্প পরিচালনায় প্রকৌশলীদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ অন্যতম। বিগত সরকার কমিটি করলেও রিপোর্ট প্রকাশ না করেই ঝুলিয়ে রেখে চলে গেছে। ফলে এই বিশাল মেধাবী গোষ্ঠীকে আমলাতান্ত্রিক বাধার কারণে ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যার ফলে ভুগবে সরকার এবং সব থেকে বেশি বাংলাদেশ।

একটি দেশের উন্নয়ন ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাঁধেই পড়ে; কিন্তু এই ব্যর্থতার কারণ প্রায়ই রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাবে নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তিগত পরামর্শের অনুপস্থিতি। প্রকৌশলীরা যখন নীতিনির্ধারণে থাকেন না, তখন যত ভালো ইচ্ছাই থাকুক, ফলাফল হয় অসম্পূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং টেকসইহীন।