পুঁজিবাজারের নতুন নেতৃত্বে মাসুদ খান, বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা ফেরানো
পুঁজিবাজারের নতুন নেতৃত্বে মাসুদ খান, বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা ফেরানো

২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর চতুর্থ দফায় বদল হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ নেতৃত্ব। ওই ধসের পর চতুর্থ চেয়ারম্যান হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার দায়িত্ব নিয়েছেন বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা মাসুদ খান। এর মাধ্যমে বিএনপি সরকার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুনর্গঠন করল।

বিগত তিন চেয়ারম্যানের মেয়াদের মূল্যায়ন

২০১০ সালে আওয়ামী লীগের মেয়াদকালে বড় ধসের পর ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন এম খাইরুল হোসেন। এর পর থেকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যন্ত বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন শিবলী রুবাইয়াত–উল–ইসলাম। আর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। এই ১৬ বছরে বিএসইসির নেতৃত্বে তিন দফায় বদল হলেও বাজারে বড় কোনো বদল আসেনি। আস্থাহীনতায় বাজারবিমুখ হন বিনিয়োগকারীরা।

বিএসইসির বিগত তিন চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মোটাদাগে কয়েকটি মূল্যায়ন রয়েছে। তাঁদের মতে, খাইরুল হোসেনের মেয়াদকালে অনিয়ম, দুর্নীতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও বাজারটি পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি খারাপ কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয় খাইরুলের মেয়াদে। এরপর শিবলী রুবাইয়াতের মেয়াদে এসে সেকেন্ডারি বাজারটি কারসাজিকারকদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। দুই চেয়ারম্যানের মেয়াদে আইপিও এবং সেকেন্ডারি বাজারের নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে বিএসইসির কর্মকর্তাদের একাংশ। এরপর বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্বে আসেন রাশেদ মাকসুদ। তাঁর সময়ে বাজারে অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও নেতৃত্ব নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল হতাশা। এ সময়ে বিএসইসির কর্মীদের একটি বড় অংশের মধ্যেই কাজের প্রতি অনীহা দেখা যায়। ফলে খুব বেশি কর্মচাঞ্চল্য ছিল না। এমনকি শেয়ারবাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ কমিশনের সদস্যরা কর্মীদের হাতে নাজেহালের শিকারও হন। এ নিয়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। মামলায়ও অভিযুক্ত করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নতুন কমিশনের চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পনা

বিগত সময়ে নষ্ট হওয়া আইপিও বাজার, সেকেন্ডারি বাজার ও উদ্যম হারানো নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেরামত করাই এখন প্রধান কাজ মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশনের। বাজারেও ফেরাতে হবে প্রাণচাঞ্চল্য। ফেরাতে হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা। এ ছাড়া ভালো কোম্পানির খরা কাটানো, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কারসাজি বন্ধ, বাজারের সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রমালিকানাধীন কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা, মুখ থুবড়ে পড়া মিউচুয়াল ফান্ড খাত মেরামত, বাজার কেলেঙ্কারির নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনাসহ চ্যালেঞ্জের তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। হতাশা কাটিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন কমিশনকে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শেয়ারবাজারকে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে আনতে কাজ করতে হবে নতুন কমিশনকে। কারণ, বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার অংশীজন ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শেয়ারবাজার নিয়ে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। সে প্রত্যাশার কথা নিজেও স্বীকার করেছেন নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান। দায়িত্ব নিয়েই গতকাল বিএসইসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ প্রত্যাশার কথা জানান নতুন চেয়ারম্যান।

নিয়োগ ও দায়িত্ব গ্রহণ

গতকাল বেলা দুইটার পর অর্থ মন্ত্রণালয় মাসুদ খানকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই সঙ্গে কমিশনের কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্সের পরিচালক তানভীর হাবিব রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব ও ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিজ আল তারিকের নিয়োগের প্রজ্ঞাপনও জারি হয়। তাঁদের চার বছরের জন্য এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বিএসইসির কমিশনের একজন কমিশনার নিয়োগ এখনো বাকি রয়েছে।

বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন এ নিয়োগের আগে গতকাল সকালে পদত্যাগ করে আগের পূর্ণাঙ্গ কমিশন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিশনকে গত বুধবারই সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এর আগে সরকার নতুন কমিশন চূড়ান্ত করে। গতকাল দুপুরের পর সেই নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ফলে বিএসইসির ১১তম চেয়ারম্যান হলেন মাসুদ খান। গতকাল বেলা সোয়া তিনটার পর তাঁর নেতৃত্বে নতুন কমিশনের সদস্যরা রাজধানীর আগাঁরগাওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

নতুন চেয়ারম্যানের বক্তব্য

দায়িত্ব নিয়েই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয় নতুন কমিশন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। সংবাদ সম্মেলনে নতুন চেয়ারম্যান তাঁর দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে শেয়ারবাজার ঘিরে তাঁদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

৩০ মিনিটের বেশি সময়ের দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে মাসুদ খান জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাজারে অযাচিত নিয়ন্ত্রণ কমানো তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি বলেন, যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং যেখানে সম্ভব, সেখানে নিয়ন্ত্রণ সহজ করতে কাজ করবে নবগঠিত কমিশন। সে সঙ্গে ভালো কোম্পানি বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থার নতুন কাঠামোও তৈরি করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। মাসুদ খান বলেন, ‘আমরা বাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাব। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে কঠোর ও স্মার্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। আর যেখানে সম্ভব, সেখানে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সহজ করে দেওয়া হবে। ধীরে ধীরে বাজারকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটালাইজড করতে কাজ করবে এই কমিশন। এমন একটি কমিশন আমরা গড়ে তুলতে চাই, যেটি হবে প্রযুক্তিনির্ভর। কাজ হবে দ্রুত ও অংশীজনদের জন্য সহজ।’

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বাজারের কারসাজি নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে রিয়েল–টাইম বা প্রকৃত সময়ভিত্তিক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কারসাজিকারকদের আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি শাস্তির মুখোমুখি হবে এবং সেটি হবে রিয়েল–টাইম ব্যবস্থা। কারসাজি নিয়ন্ত্রণে জেড শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির ওপর শুরু থেকে বিশেষ নজরদারি করা হবে। বিএসইসির সব ধরনের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা।

বিএসইসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান আরও বলেন, শেয়ারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা বাজারের উত্থান-পতন ঠেকানোর কৃত্রিম কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হবে না কমিশন। শেয়ারের বাজারভিত্তিক ন্যায্যমূল্য যাতে নিশ্চিত হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করবে এই কমিশন। এ সময় তিনি আরও বলেন, নতুন কমিশনের দর্শন হচ্ছে প্রথমে স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ, তারপর ডিজিটালাইজেশন, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ধারাবাহিকভাবে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া

নতুন কমিশন প্রসঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন কমিশনের কাছে আমাদের প্রধান প্রত্যাশা, নষ্ট হয়ে যাওয়া বাজারের ইকো সিস্টেমটা ফিরিয়ে আনা হোক। আমরা চাই শেয়ারবাজার বিনিয়োগের সেই আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে আসুক। ভালো শেয়ার কিনে দীর্ঘ মেয়াদে কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আবার মন্দ শেয়ারের দাপটে ভালো শেয়ারগুলো আস্থা না হারায়। শেয়ারবাজারকে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে আসুক। যেখানে বিনিয়োগে আস্থা পাবেন দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ভালো কোম্পানিগুলোও বাজারে আসতে আগ্রহী হবে।’