ইইউ পোশাক বাজারে ডিসেম্বরে ধাক্কা: বাংলাদেশের রফতানি মূল্য ১২% কমেছে
২০২৫ সালের পুরো বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক বাজারে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে স্পষ্ট ধাক্কার চিত্র ফুটে উঠেছে। ইউরোপীয় পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০২৪-এর তুলনায় ডিসেম্বর ২০২৫-এ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। পুরো বছরের হিসাবে বাজার ২ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু ডিসেম্বরের পতন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বছরের শেষভাগে চাহিদা কমেছে এবং দামের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের রফতানিতে উল্লেখযোগ্য পতন
ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ডিসেম্বর মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ডিসেম্বর ২০২৪-এর তুলনায় ডিসেম্বর ২০২৫-এ রফতানি মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ, সরবরাহের পরিমাণ কমেছে ০ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং গড় একক দাম কমেছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, পরিমাণে বড় পতন না থাকলেও দামের পতনই মোট রফতানি আয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। অর্থাৎ বাজার ধরে রাখতে সরবরাহ প্রায় একই থাকলেও ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনেছেন।
সার্বিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যচাপ
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন অঞ্চলে তৈরি পোশাক আমদানি ২ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে মোট ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল আমদানির পরিমাণে ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে একই সময়ে গড় একক মূল্য ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে, যা বাজারে মূল্যচাপের ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিও বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ। রফতানির পরিমাণ ১০ দশমিক ২০ শতাংশ বাড়লেও গড় একক মূল্য ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। তবে বছরের শেষ দিকে কিছুটা ভাটা দেখা গেছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান
অন্য প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যেও সার্বিকভাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। চীন ইইউতে ২৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি। দেশটির রফতানি পরিমাণ ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে, যদিও একক মূল্য ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমেছে।
ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ভিয়েতনাম ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের রফতানি করেছে এবং দেশটির একক মূল্য ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের রফতানি ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতামত
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “ইইউ বাজারে সার্বিক আমদানি বেড়েছে, কিন্তু মূল্যহ্রাসের কারণে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিমাণ বাড়লেও ইউনিট প্রাইস কমে যাওয়ায় প্রকৃত আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।” তিনি আরও বলেন, “ডিসেম্বরের নিম্নমুখী প্রবণতা সতর্কবার্তা দিচ্ছে— আমাদের এখন উচ্চমূল্যের পণ্য, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের দিকে আরও জোর দিতে হবে।”
ইউরোপের বাজারে প্রবণতা
ডিসেম্বর মাসের তথ্য বলছে, ইউরোপীয় বাজারে তিনটি প্রবণতা স্পষ্ট:
- প্রথমত, ক্রেতারা বড় অঙ্কের অর্ডারের বদলে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
- দ্বিতীয়ত, দামে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
- তৃতীয়ত, সরবরাহকারী দেশগুলো বাজার ধরে রাখতে মূল্যছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।
এর ফলে গড় একক দাম দ্রুত কমেছে। পুরো বছরে একক দাম কমলেও ডিসেম্বর মাসে তা আরও তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে বড় পরিমাণে উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ডিসেম্বরের উপাত্ত বলছে, পরিমাণে স্থিতিশীলতা থাকলেও দামে চাপ বাড়লে মোট আয় দ্রুত কমে যেতে পারে। উৎপাদন ব্যয়, বিশেষ করে মজুরি, জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে গড় একক দাম কমে গেলে শিল্পের মুনাফা সংকুচিত হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু পরিমাণ বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। মূল্য সংযোজন, উন্নত নকশা, বৈচিত্র্যময় পণ্য এবং গুণগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে একক দাম বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সামনে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
- ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা।
- উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা।
- উচ্চমূল্যের পণ্যে অংশীদারিত্ব বাড়ানো।
সব মিলিয়ে ডিসেম্বরের হিসাব বলছে, ইউরোপের পোশাক বাজার এখন পরিমাণের চেয়ে দামের লড়াইয়ে বেশি নির্ধারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এখন জরুরি বাজার ধরে রেখে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে টেকসই আয় নিশ্চিত করা।
