রেমিট্যান্স পাঠাতে স্টেবল কয়েনের ব্যবহার বাড়ছে, নজরদারির অভাব উদ্বেগজনক
বাংলাদেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পাঠাতে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশেষ করে স্টেবল কয়েনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্লকচেইন পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান চেইনালাইসিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি গত এক বছরে দুইটি প্রতিবেদনে এই বিষয়ে মন্তব্য করেছে।
ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে দ্রুত লেনদেন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং চ্যানেলের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে প্রবাসীরা পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্টেবল কয়েন ব্যবহার করে দ্রুত টাকা পাঠাচ্ছেন। এই ক্রিপ্টো লেনদেনের সিংহভাগই হচ্ছে টিথার দিয়ে। পাঠানো টাকা দেশে উত্তোলন করা হচ্ছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে, যাতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট।
আরেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির গ্রাহকের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১২৫ ভাগ। যার বড় অংশ স্টেবল কয়েনের মতো পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন। এতে লেনদেনের খরচ কমেছে প্রায় ৪ ভাগ।
স্টেবল কয়েন কী?
ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে স্টেবল কয়েন একটি নতুন সেলিব্রিটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর আবির্ভাব ঘটে ২০১৪ সালে। ডিজিটাল মুদ্রাকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে এটি চালু করে টিথার লিমিটেড নামের এক মার্কিন কোম্পানি। এটি ডলার পেগড, অর্থাৎ ১ স্টেবল কয়েনের দাম ১ ইউএস ডলারের সমান।
ডিজিটাল কারেন্সির দাম ওঠা-নামা নিয়ে ব্যবহারকারীদের স্বস্তি দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিথারের পর স্টেবল কয়েন প্রকল্পে নাম লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের সার্কেল অ্যান্ড কয়েনবেজ এবং চীনের বাইন্যান্সের মতো ক্রিপ্টোজায়ান্ট কোম্পানি।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ
প্রায় দুই বছর ধরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের গতি ইতিবাচক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মাঝেও মার্চের প্রথম ১৪ দিনে ২২০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এসব অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসার সুবাদে রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এজন্য প্রবাসীরা বাড়তি প্রণোদনাও পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মোহাম্মদ আহসান হাবীব বলেছেন, স্টেবল কয়েনের স্থিতিশীলতা মোটামুটি নিশ্চিত হলেও এটি সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (সিবিডিসি) থেকে ভিন্ন, যা নিয়ন্ত্রিত। সাধারণ মানুষের এই ঝুঁকি বোঝার মতো সক্ষমতা আছে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।
জাইতুন বিজনেস সল্যুশনের চেয়ারম্যান মো. আরফান আলী বলেছেন, স্টেবল কয়েনের বিপরীতে সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা বাংলাদেশে ঢুকছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এসব বিষয় ব্যাংক টু ব্যাংক বা বৈধ ডিলারের মাধ্যমে করা উচিত।
আইনগত অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার ও লেনদেন আইনত নিষিদ্ধ হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই অবস্থান বাংলাদেশের, আর বিশ্বে ১৩তম। ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত তরুণদের বড় অংশ এখন বিদেশ থেকে পেমেন্ট আদায়ে ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছেন। অনলাইন গেমিং ও বেটিং সাইটে পেমেন্টের জন্যও ক্রিপ্টোকারেন্সি জনপ্রিয় হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) রিপোর্টেও ক্রস বর্ডার পেমেন্টে স্টেবল কয়েনের ব্যবহারের কথা এসেছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এর ব্যবহারের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া হয়নি। সংস্থাটি স্টেবল কয়েন নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইন করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি এড়াতে নিত্যনতুন গেটওয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এই ডিজিটাল লেনদেনের উপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।



