রাজধানীতে নিত্যপণ্যের দামে চাপ, সয়াবিন তেল সংকটে ভোক্তাদের দুর্ভোগ
রাজধানীতে নিত্যপণ্যের দামে চাপ, সয়াবিন তেল সংকট

রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে চাপ, সয়াবিন তেল সংকটে ভোক্তাদের দুর্ভোগ

রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেন কমছেই না। মাসের বাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষদের। এদিকে, সংকট দেখা দিয়েছে বোতলজাত সয়াবিন তেলে। মাছ ও মাংসের পাশাপাশি গেলো কিছুদিনের তুলনায় প্রতিটি সবজি কিনতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের অপ্রতুলতার কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে, সেই সঙ্গে অনেক সবজির মৌসুম শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে নিত্যপণ্যের সরবরাহ তুলনামূলক কম হওয়ায় বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সবকিছু।

বাজারের হালচাল: মাছ, মাংস ও ডিমের দামের অবস্থা

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাজধানীর রায়সাহেব বাজার, তাঁতিবাজার, নারিন্দা কাঁচা বাজার ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে। মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, আকারভেদে প্রতি কেজি তেলাপিয়া, কই ও পাঙাশ মাছ ২২০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের চাষের চিংড়ির কেজি ৮০০ টাকা। চাষের শিং, পাবদা ও পোয়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে। রুই, মৃগেল ও কাতল মাছ ওজনভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া চাষের শিং বা পাবদা মাছের কেজি ৫০০ টাকা।

বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম খুব বেশি না বাড়লেও ঈদের পর থেকে রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি ও দেশি মুরগি। প্রতি কেজি ব্রয়লার ২২০ থেকে ২৪০ টাকা, সোনালি মুরগি ৪২০ থেকে ৪৪০ টাকা ও দেশি মুরগি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেড়েছে ডিমের দামও। রমজানে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ডিমের দাম ছিল সর্বনিম্ন। ওই সময় ডজন বিক্রি হয় ৯০ থেকে ১১০ টাকায়। এখন ডজন বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। আর সাদা ডিমের ডজন ১১০ টাকা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সয়াবিন তেল সংকট: সরবরাহ কম ও দাম বৃদ্ধি

বিভিন্ন দোকানে পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল মিললেও সরবরাহ কম। আধা লিটার, এক ও দুই লিটারের বোতল বেশিরভাগ দোকানেই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু দোকানে খোলা সয়াবিন তেল মিললেও তা বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশিতে। সরকার নির্ধারিত এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম ১৯৫ টাকা। অন্যদিকে, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা ও পাম তেলের নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা। তবে বাজারে খোলা সয়াবিন ২০০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর পাম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলাররা তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থা মাসখানেকের বেশি সময় ধরে চললেও গত তিন-চার দিন ধরে একেবারে অর্ডার নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। নারিন্দা বাজারের ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ জানান, বিভিন্ন কোম্পানি এখন আর সরাসরি তেলের অর্ডার নিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে শর্ত দেওয়া হচ্ছে, তেল নিতে হলে সঙ্গে অন্য পণ্যও নিতে হবে। ফলে বাধ্য হয়ে তারা পাইকারি বাজার থেকে তেল সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।

তিনি আরও বলেন, দোকানে তেল না থাকলে ক্রেতারা অন্যান্য জিনিসও কিনতে আগ্রহ দেখায় না। এতে নিয়মিত ক্রেতারাও ফিরে যাচ্ছেন, আর বিক্রিও কমে যাচ্ছে। এ কারণে বেশি দামে পাইকারি বাজার থেকে তেল কিনে এনে বিক্রি করতে হচ্ছে।

সবজির দাম বৃদ্ধি: মৌসুম শেষ ও পরিবহন খরচের প্রভাব

গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে বাজারে বেড়ে গেছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। বেশিরভাগ সবজিই এখন ৮০ টাকার বেশি বা তার কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। শুধু আলুর কেজি ২৫ আর পেঁপে-গাজর বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে। বাজারে এখন প্রতি কেজি পটোল ও ঢ্যাঁড়স ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সিম ও সজিনা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, বরবটি, করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা ও কাকরোল ১২০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে কম রয়েছে কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজের দাম। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা ও পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

রায়সাহেব বাজারের সবজি বিক্রেতা জলিল জানান, অনেক সবজির মৌসুম শেষ হয়েছে। মৌসুম শেষ হওয়ায় সরবরাহ তুলনামূলক কমে যাওয়ায় সবজি বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের কিছু করার নাই, আমরা আড়ত থেকে বেশি দামে নিয়ে আসছি। এ জন্য বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া ও সরকারের প্রতি আহ্বান

বাজারে কেনাকাটা করতে এসেছে আজিম মিয়া নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই অন্যান্য পণ্যের ওপর পড়তে শুরু করেছে এবং সামনে আরও বাড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বে আমার মতো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ পরিস্থিতিতে তাদের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।

সর্বোপরি, রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সয়াবিন তেল সংকট নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরকারি হস্তক্ষেপ ও বাজার মনিটরিং জোরদার করা না হলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।