বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর বাজার নিয়ন্ত্রণ ও যৌক্তিক মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
বাজার নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
মন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছায়। এ লক্ষ্যে গৃহীত উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলো নিম্নরূপ:
১. আইনগত সংস্কার
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য The Control of Essential Commodities Act, 1956 যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনটির প্রয়োজনীয় সংশোধন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
২. মূল্য সমন্বয় ও স্থিতিশীলতা
ভোজ্য তেল: বর্তমানে ভোজ্য তেলের মূল্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত হয় এবং কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে মূল্যেও সমন্বয় করা হয়। চলতি পঞ্জিকা বছরে তিন বার এ সমন্বয় করা হয়েছে।
অন্যান্য পণ্য: বিগত পঞ্জিকা বছরব্যাপী অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। পেঁয়াজের বাজার মূল্য বছরব্যাপী উৎপাদন মূল্যের কাছাকাছি থাকলেও গত বছরের মাঝামাঝি ও ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মূল্যবৃদ্ধি দেখা দেয়। কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ সিদ্ধান্তে দুই বার আমদানি উন্মুক্ত করার পর মূল্য স্বাভাবিক হয়।
৩. গবেষণা কার্যক্রম
দেশে নিত্যপণ্যের বাজার ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভারত ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রচলিত মডেল পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য একটি আদর্শ মডেল নিরূপণের লক্ষ্যে Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS) কে গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. শুল্ক হ্রাস
এ বছরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুর আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। এর ফলে উক্ত পণ্যসমূহের মূল্য স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
৫. বাজার অভিযান ও তদারকি
- জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ঢাকায় প্রতিদিন ৪টি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২টি বাজার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
- সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাজার অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অনিয়ম ধরা পড়লে সতর্কতা ও জরিমানা আরোপ করা হয়।
- পবিত্র রমজান মাস বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অভিযানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।
- বিশেষ উৎসবের পূর্বে ভোগ্য পণ্যের উৎপাদক, আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের সঙ্গে সভার মাধ্যমে সরবরাহ মূল্য মনিটরিং করা হয়।
- মন্ত্রী ও সচিব কর্তৃক আকস্মিক বাজার পরিদর্শন, যেমন চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ বাজার পরিদর্শন ও মতবিনিময় করা হয়েছে।
- এলপিজি আমদানি ও বিপণনকারীদের সঙ্গে সভার মাধ্যমে সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৬. ব্যাংকিং সমস্যা সমাধান
জ্বালানিসহ ভোগ্য পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি ও উৎপাদনকারীদের ব্যাংকিং সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
৭. বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন
জেলা পর্যায়ে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স স্থানীয় আড়ৎ, গোডাউন, কোল্ড স্টোরেজ ও সাপ্লাই চেইন সরেজমিনে পরিদর্শন করে বাজার পরিস্থিতি তদারকি করছে। দ্রব্যমূল্য যৌক্তিক রাখতে এবং উৎপাদক, পাইকারি ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের পার্থক্য ন্যূনতম রাখতে নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
৮. ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, চেম্বার প্রতিনিধি ও সর্বস্তরের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য পর্যালোচনা ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
৯. টিসিবি কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি
নিম্ন আয়ের প্রায় এক কোটি জনসাধারণের মধ্যে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে চাল, সয়াবিন তেল, চিনি ও মশুর ডাল বিতরণ করা হচ্ছে। এতে বাজার স্থিতিশীল রাখা ও দরিদ্র জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হচ্ছে।
১০. কৃষি মার্কেট পাইলটিং
সিলেট জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে কৃষি মার্কেট চালু করা হয়েছে। পাইলটিং সফল হলে সারা বাংলাদেশে এ উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী আরও জোর দিয়ে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোক্তা স্বার্থ রক্ষা ও বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যৌক্তিক মূল্য ও সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।



