রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: সংযমের মাসে উদ্বেগের বাজার
রমজানে দ্রব্যমূল্য: সংযমের মাসে উদ্বেগের বাজার

রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: সংযমের মাসে উদ্বেগের বাজার

পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার একটি বিশেষ সময়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিবছর এই মাসটি যেন আরেকটি কঠিন অর্থনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। ২০২৬ সালের রমজান মাসও তার ব্যতিক্রম নয়। বাজারে ঢুকলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সংযমের এই পবিত্র সময়টি সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মাসে রূপ নিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে ইবাদতের প্রশান্তির বদলে হিসাব-নিকাশের উৎকণ্ঠাই বড় হয়ে উঠছে।

লেবুর দাম: বাজারব্যবস্থার অস্বাভাবিকতার প্রতীক

এ বছর রমজান মাসের শুরুতেই বাজারে লেবুর দাম ২০০ টাকা ছুঁয়েছে। যে লেবু কয়েক মাস আগেও ছিল সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে, তা এখন বাজারব্যবস্থার এক অস্বাভাবিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একটি সাধারণ কৃষিপণ্য কীভাবে এত দ্রুত বিলাসপণ্যে রূপান্তরিত হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। এর উত্তর অনেকেই জানেন, কিন্তু উচ্চারণ করতে চান না ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের ভূমিকার কথা।

বাজার অর্থনীতিতে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একধরনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদনের ব্যয় সামান্য বাড়লেও খুচরা বাজারে মূল্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। অর্থাৎ মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব অর্থনীতি নয়, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেট শুধু ব্যবসায়ীদের নিয়ে গঠিত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক নীরবতা এবং নিয়ন্ত্রণহীন বাজারকাঠামো।

সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ: আশ্বাস বনাম বাস্তবতা

প্রতিবারই সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দেয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত নামানো হয়, কিছু দোকানিকে জরিমানা করা হয়, সংবাদমাধ্যমে ছবি ছাপা হয়; কিন্তু কয়েক দিন পর সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কারণ, সমস্যাটি ব্যক্তি নয়, কাঠামোগত। সিন্ডিকেট ভাঙার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—সরকার বদলায়, ক্ষমতা যায়-আসে; কিন্তু জনগণের ভাগ্য বদলায় না। ক্ষমতার পালাবদলের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি শোনা যায়—দুর্নীতি বন্ধ হবে, বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে, মধ্যস্বত্বভোগীরা হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শুধু মুখ বদলায়, ব্যবস্থা একই থাকে।

রমজানে সংকটের প্রকটতা

রমজান মাসে এই সংকট আরও প্রকট হয়। কারণ, এ সময় খাদ্য ব্যয়ের চাপ স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। ইফতারি ও সাহ্‌রির জন্য অতিরিক্ত খাদ্য কিনতে হয়, অথচ আয় বাড়ে না। একজন দিনমজুর, নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী কিংবা ছোট ব্যবসায়ীর কাছে প্রতিদিনের বাজার এখন একধরনের মানসিক চাপ। তাঁরা হিসাব করেন আজ ডাল নেবেন, নাকি তেল? ফল কিনবেন, নাকি সবজি? ইবাদতের মাসে এমন দোটানা একটি সামাজিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে।

সংস্কারের বুলি বনাম বাস্তব পরিবর্তন

আমরা প্রায়ই শুনি, সংস্কার চলছে, অর্থনীতি পুনর্গঠন হচ্ছে, নীতিমালা পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, সংস্কারের বুলিতে কি মানুষের পেট ভরে? নীতিগত ভাষণ বা উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে বাজারের থলে ভরানো যায় না। মানুষ চায় বাস্তব পরিবর্তন—কম দামে খাদ্য, স্থিতিশীল বাজার ও ন্যায্য জীবনযাত্রা। রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনগণের পাশে দাঁড়াতে চায়, তাহলে কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সমাধানের পথ: কাঠামোগত পরিবর্তন

প্রথমত, আমদানি ও পাইকারি পর্যায়ে স্বচ্ছ মূল্যতালিকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাজার সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য কমাতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনের প্রয়োগ হতে হবে ধারাবাহিক, মৌসুমি নয়। রমজান মাসের শিক্ষা আমাদের সংযম হতে শেখায়, কিন্তু সেই সংযমের দায়িত্ব শুধু ভোক্তার নয়; ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রেরও আছে। অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের মানসিকতা যখন ধর্মীয় অনুভূতিকেও অতিক্রম করে যায়, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও তৈরি করে।

সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন

আজ প্রয়োজন সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার নামে নাটক নয়; বরং সিন্ডিকেট ভাঙার বাস্তব উদ্যোগ। কারণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। রমজান মাসে মানুষকে ক্ষুধার অনুভূতি বোঝাতে শেখায়, যাতে ধনীরা দরিদ্রের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু যদি পুরো সমাজই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা অর্থহীন হয়ে যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে ইবাদতের মাস মানুষের জন্য বোঝা নয়; বরং প্রশান্তির সময় হয়ে ওঠে। না হলে প্রতিবছর একই গল্প লেখা হবে দাম বাড়বে, বক্তব্য আসবে, সরকার বদলাবে; কিন্তু জনগণের ভাগ্য বদলাবে না। আর তখন রমজান মাসে সংযম নয়, বেঁচে থাকার সংগ্রামই হয়ে উঠবে প্রধান বাস্তবতা।