রমজানে লেবুর দামে আকস্মিক ওঠানামা, ক্রেতাদের অভিযোগ ব্যবসায়ীদের অতিলোভ
রমজানে লেবুর দামে ওঠানামা, ক্রেতাদের অভিযোগ

রমজানে লেবুর দামে আকস্মিক ওঠানামা, ক্রেতাদের অভিযোগ ব্যবসায়ীদের অতিলোভ

ইফতারে লেবুর শরবতের জনপ্রিয়তার কারণে প্রতিবছর রমজান মাস শুরুর আগে লেবুর দাম বেড়ে যাওয়া যেন একটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রমজান মাস শুরুর ঠিক আগের দিন বুধবার ও প্রথম রোজার দিন বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আকার ও মানভেদে এক হালি লেবু বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। রাজধানীর অন্যান্য বাজারেও লেবুর দাম কমবেশি একই রকম ছিল। তবে রমজানের দ্বিতীয় দিনে লেবুর দাম কিছুটা কমেছে। গত শুক্রবার কারওয়ান বাজারে প্রতি হালি লেবু ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে, যা এক দিন আগেও ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।

বাজারে ঘাটতি নেই, তবু দাম বাড়ার কারণ কী?

রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বর সেকশন, মিরপুর-১১ নম্বর, আগারগাঁওয়ের তালতলা ও কারওয়ান বাজার—এই চারটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে লেবুসহ অন্যান্য পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। নয় জন বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা প্রায় একই ধরনের উত্তর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রতিবছর রমজানের শুরুতে সব পণ্যের দাম বাড়ে, এটা নতুন কিছু নয়। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে লেবুর দামে এতটা হেরফের হওয়ার কারণ হিসেবে ক্রেতাদের অনেকে কিছু ব্যবসায়ীর অতিলোভকে দায়ী করছেন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, যখনই কোনো পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়, তখনই ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেন। লেবুর বাজারে গত তিন–চার দিনে যা ঘটেছে, তা ঠিক চাহিদা ও জোগানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ক্রেতাদের ঠকিয়ে বাড়তি মুনাফা অর্জনের প্রবণতা এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যার মূল কারণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়।

পেঁয়াজ ও মুরগির দামেও ওঠানামা

দুই দিনের ব্যবধানে দাম আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে এমন পণ্যের তালিকায় লেবুর পাশাপাশি রয়েছে পেঁয়াজ ও মুরগি। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ (মুড়িকাটা) বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়, যেখানে রোজার আগের দিন ও প্রথম দিনে দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। একইভাবে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৮০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকায়। দুই দিন আগে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং সোনালি ৩৪০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং সোনালি ২৮০ টাকা।

মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের কাঁচাবাজারের বিক্রয়কর্মী মামুনুর রশিদ বলেন, 'প্রতিবছরই তো রোজা এলে মুরগির দাম বেড়ে যায়। কারণ তো আর আমরা জানি না।' বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রোকন ইসলাম অভিযোগ করেন, ডাল, তেল, সবজির বাড়তি দামের পাশাপাশি মুরগির দামও বেড়ে গেছে, যা বাজারে হিসাব মেলানো কঠিন করে তুলছে।

সবজির দামেও বৃদ্ধি

কাঁচা মরিচ, শসা, ক্ষীরা ও টমেটোর দাম আরও বেড়েছে। মান ও জাতভেদে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ গতকাল বিক্রি হয়েছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়, যা দুই দিন আগেও ছিল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা। শসা ও ক্ষীরা বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, তিন দিন আগে যার দাম ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা। টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও কয়েক দিন আগে ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। মিরপুর-৬ নম্বর কাঁচাবাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আতিক হোসেন বলেন, গত বুধবার ১০ কেজি কাঁচা মরিচ তিনি ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছিলেন, কিন্তু গতকাল সকালে কিনতে হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকায়, যার কারণে আগের চেয়ে কেজিতে ৪০ টাকা বেশি রাখতে হচ্ছে।

ক্রেতাদের অসহায়ত্ব ও সরকারি তদারকির প্রয়োজন

রাজধানীর চারটি বাজারে ছয়জন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের সবার মতে, রমজান এলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, এই 'নিয়তি' মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। পাইকারি থেকে খুচরা—সব পর্যায়ের বিক্রেতারা রমজানে অতিরিক্ত মুনাফা করেন। এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরকারের নিবিড় নজরদারি দরকার। অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। এ জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। বাজার তদারকি এখনো সাময়িক ও পরিস্থিতিনির্ভর, যা সারা বছর হওয়া উচিত।

ইফতারে বেগুনি খাওয়ার প্রচলনের কারণে বেগুনের দামও বেড়েছে। রোজার শুরু থেকে প্রতি কেজি লম্বা বেগুনের দাম ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা হয়েছে। একইভাবে ধনেপাতার দামও ২০ টাকা বেড়ে ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা আশা করছেন, সরকারি তদারকি বাড়লে এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।