‘প্রতিদিনই কোনও না কোনও সবজির দাম বাড়ছে। সীমিত আয়ের মানুষ হিসেবে সংসারের খরচ সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। আগে পরিবারের জন্য কয়েক ধরনের সবজি কিনতে পারতাম, এখন খরচের কারণে অনেক কিছুই কমিয়ে দিয়েছি। বাজারে এসে এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তা করতে হয়, কোন জিনিসটা কম কিনলে চলবে।’ শুক্রবার পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারে বাজার করতে আসা নাসিমা আক্তার নামে এক নারী সবজির দাম নিয়ে আক্ষেপ করে এসব কথা বলেন।
অন্য আরও কয়েকজন ক্রেতার ভাষায়, আয় না বাড়লেও প্রতিদিন কোনও না কোনও পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজধানীর বাজারে ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের দাম। বিশেষ করে সবজির বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। শুক্রবার রায়সাহেব বাজার, কলতা বাজার, নারিন্দা বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন তথ্য জানা গেছে।
সবজির দাম বাড়ার কারণ
ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে কৃষকের ক্ষতি হওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। বেশ কিছু মৌসুমি সবজির সময় শেষ হওয়ায় বাজারে সংকট আরও বেড়েছে। তাদের দাবি, দাম বাড়ায় ক্রেতাদের কেনার পরিমাণও কমে গেছে। আগে যেখানে একজন ক্রেতা এক কেজি সবজি কিনতেন, এখন অনেকেই আধা কেজি করে কিনছেন। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরাও আগের তুলনায় কম পরিমাণে সবজি তুলছেন।
বিভিন্ন সবজির বর্তমান দাম
বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দামের তালিকায় রয়েছে কাঁকরোল, শসা ও বেগুন। প্রতি কেজি কাঁকরোল ১২০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, দেশি শসা ১২০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পটোল ৮০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, ধুন্দল ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৬০ টাকা, পেঁপে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। একইসঙ্গে প্রতিটি লাউ ৭০ থেকে ৮০ টাকা, জালি ৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরগি, মাছ ও মাংসের বাজার
মুরগি বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি গত সপ্তাহের মতোই ১৭০-১৮০ টাকা, পাকিস্তানি সোনালি মুরগি ৩৩০-৩৫০ টাকা, দেশি মুরগি ৬০০-৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকারভেদে রুইমাছ ৩০০-৩৮০ টাকা, টেংরা ৪০০-৫৬০, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা, মৃগেল ২২০-২৫০ টাকা, পাঙাশ ১৫০-২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০-২৫০, কাতল ৩০০-৫০০ টাকা, বাটা ১৮০-২৪০ টাকা, শিং ৩০০-৪০০ টাকা, সিলভার কার্প ১৮০-২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে গরু ও খাসির মাংসের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
রায়সাহেব বাজারের সবজি বিক্রেতা ফারুক হোসেন জানান, সবজির দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। তার ওপর গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কৃষকের সবজি নষ্ট হয়েছে এবং অনেক সবজির মৌসুম শেষ দিকে হওয়ায় সরবরাহ কম। আমরা আগে যে সবজি ২০ কেজি আনতাম, এখন দাম বেশি হওয়ায় ১০ কেজি করে আনছি। কারণ ক্রেতারা এখন ১ কেজির জায়গায় আধা কেজি করে কিনছেন। সবজি বিক্রেতা আব্দুল করিম বলেন, বৃষ্টি আর পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে কম লাভে। দাম বাড়ার কারণে ক্রেতার সংখ্যাও আগের তুলনায় কমে গেছে। অনেকেই এখন প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনছেন।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, বাজারে নতুন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম আবার কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে আপাতত সাধারণ ক্রেতাদের পকেট কাটছে চড়া বাজার দর। নারিন্দা বাজারে সবজি কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এখন বাজারে এসে ৫০০ টাকার নিচে ঠিকমতো বাজার করাই কঠিন হয়ে গেছে। আগে যে সবজি এক কেজি করে কিনতাম, এখন বাধ্য হয়ে আধা কেজি বা তারও কম কিনতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই বেশি, তার ওপর সবজির দাম বাড়ায় সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।



