জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাইকারির পর খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকের কাছ থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি কোম্পানি (নেসকো) প্রথম গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন করে। তবে ইউনিটপ্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ দামের কথা না বলে পাইকারি দাম সমন্বয় করে দাম বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করে কোম্পানিটি।
বিইআরসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য
কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ মঙ্গলবার বিকালে নেসকোর আবেদন জমা পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, নেসকোর আগে পিডিবি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। মন্ত্রিসভা কমিটির প্রস্তাবনার ভিত্তিতে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। খুচরার ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে দাম বাড়ানোর কথা জানিয়েছে নেসকো। জালাল আহমেদ বলেন, ‘কালকের মধ্যে হয়তো আরও অনেক কোম্পানি প্রস্তাব দিয়ে ফেলবে। সব প্রস্তাব পেলে কারিগরি কমিটি কাজ শুরু করবে। এরপর গণশুনানির তারিখ ঠিক করা হবে।’
পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকার বিইআরসি’র বদলে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের বিধান তৈরি করে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষবার বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করেছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার আগের সরকারের সেই আইন বাতিল করে ‘বিইআরসি আইন ২০০৩’ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা পুনরায় চালু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৩ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সোমবার (৪ মে) পিডিবি বিদ্যুতের বাল্ক মূল্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করে।
পিডিবির বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ১২ টাকা ৫০ পয়সায়। অন্যদিকে পিডিবি বাল্ক বিদ্যুৎ বিক্রি করে ইউনিট প্রতি ৭ টাকায়। ফলে প্রতি ইউনিটে সরকার পিডিবিকে ভর্তুকি দেয় সাড়ে পাঁচ টাকা। সরকার গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি বছর আরও ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি দাবি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সরকারের পক্ষে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা উভয় মূল্য বাড়ানো হচ্ছে। যদিও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল।
বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামো
উল্লেখ্য, পিডিবি এককভাবে দেশে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ কিনে নেয়। এরপর সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের শহরাঞ্চলে বিতরণ করে। রাজধানীতে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। খুলনা ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার শহরাঞ্চলে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি রাজশাহী ও রংপুর শহরে বিদ্যুৎ বিতরণ করে। সারা দেশের গ্রামে বিদ্যুৎ বিতরণ করে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীনে থাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
বর্তমানে গ্রাহকের কাছ থেকে ইউনিট ভেদে দাম নির্ধারণ করা হয়: ০-৫০ ইউনিট ৪.৬৩ টাকা, ৫১-৭৫ ইউনিট ৫.২৬ টাকা, ৭৬-২০০ ইউনিট ৭.২০ টাকা, ২০১-৩০০ ইউনিট ৭.৫৯ টাকা, ৩০১-৪০০ ইউনিট ৮.০২ টাকা, ৪০১-৬০০ ইউনিট ১২.৬৭ টাকা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ১৪.৬১ টাকা। তবে এই দামের সঙ্গে ডিমান্ড বা সার্ভিস চার্জ, ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ও মিটার ভাড়া যোগ হয়।
এলপিজি ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি
এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই মাসে দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া গত ১৮ এপ্রিল দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। সে সময় অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ানোর পর এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রাহকের ওপর। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে মধ্যবিত্তরা ভোগান্তি পোহাচ্ছে। এলপিজির নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হয় গ্রাহকদের। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।
বেসরকারি চাকরিজীবী মিলি আক্তার বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধির পরদিন থেকেই বাজারে সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। বাজার করতে গিয়ে আমরা মধ্যবিত্তরা হিমশিম খাচ্ছি। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়লে সেটি আরও বড় ভোগান্তির কারণ হবে।’ সরকারি কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ জানান, ‘সরকারি বেতন দিয়ে কষ্টে সংসার টানি। তেলের দাম বাড়ার পর বাজারের জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। বাসায় গ্যাস না থাকায় এলপিজি ব্যবহার করি, সেটার দামও বেড়েছে। এখন বিদ্যুতের বিল বেশি হলে আমরা কোথায় যাব?’
বিশেষজ্ঞের মতামত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘আগের সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের লুটপাটের অর্জন এই দাম বৃদ্ধি। বর্তমান সরকার তাদের বিচার না করে, তাদের অতিরিক্ত মুনাফা ও ব্যয় বৃদ্ধি না কমিয়ে, ভর্তুকি না কমিয়ে দায় চাপাচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর। এভাবে অবিচারের খড়গ নেমে আসে মানুষের ওপর।’



