সঞ্চয়পত্র কেনায় মানুষের আগ্রহ কমেছে, ভাঙার প্রবণতা বেড়েছে
সঞ্চয়পত্র কেনায় আগ্রহ কমেছে, ভাঙার প্রবণতা বেড়েছে

সঞ্চয়পত্র কেনায় মানুষের সামর্থ্য কমেছে। যাঁরা আগে কিনেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন সঞ্চয়পত্র ভেঙে টাকা তুলে ফেলছেন। যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়, তার চেয়ে বেশি টাকার সঞ্চয়পত্র ভেঙে টাকা তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকেরা। এই প্রবণতা কয়েক বছর ধরে চলছে। এর ফলে টানা চার বছর ধরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার ঋণ নিতে পারছে না।

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমেছে কেন

বাজারের এফডিআরসহ অন্যান্য আর্থিক পণ্যের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি। তবু সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ কমেছে। এর অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলাতে গিয়ে মানুষের হাতে সঞ্চয় করার মতো টাকা থাকছে না। অর্থাৎ সঞ্চয়ের সামর্থ্যই কমে গেছে।

সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সরকারের এই সঞ্চয়পত্র ছিল সঞ্চয়ের ভরসা। চিকিৎসাসহ বিপদ–আপদে টাকার দরকার হলে কিংবা সংসারের খরচের চাপ সামলাতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাই ছিল বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস। কিন্তু এখন মানুষ সঞ্চয়পত্র কেনা কমিয়েছেন এবং আগের কেনা সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সংসারের বাড়তি খরচ মেটাচ্ছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাস্তব উদাহরণ

একটি আবাসন কোম্পানিতে চাকরি করেন জাকির হোসেন। তাঁর ছেলে চলতি মাসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে (এআইইউবি) ভর্তি হয়েছে। ভর্তির সময় প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। হাতে এত টাকা না থাকায় তিনি এক লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছেন। জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলের ভর্তির সময় টাকা লাগতে পারে, এই চিন্তা করে তিন বছর আগে স্ত্রীর নামে এক লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনেছিলাম। এখন তা ভেঙে ভর্তির টাকা জোগাড় করলাম।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সালমা আলম একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা। তিনি দুই বছর আগে ব্যাংকঋণ নিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। তখন নিজের নামে থাকা পাঁচ লাখ টাকার একটি সঞ্চয়পত্র ভেঙে ব্যয় করেন। সালমা আলম বলেন, ‘বিপদের সময়ের সহায়ক হিসেবে বাবা সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছিলেন। ফ্ল্যাট কেনার সময় তৎক্ষণাৎ টাকা জোগাড় করতে সঞ্চয়পত্র ভেঙেছিলাম; কিন্তু পরিবারের খরচের চাপ আর কমেনি। ফলে ওই টাকা সঞ্চয়পত্র হিসেবে আবার রাখার সুযোগ হয়নি।’

সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব মো. আবদুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, চার বছর ধরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক হওয়ার কারণ হচ্ছে মানুষ বেশি ভাঙাচ্ছেন। বেশি টাকার বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল বা বন্ডে চলে যাচ্ছেন, এটাও একটা কারণ হতে পারে। সরকার ধীরে ধীরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমাচ্ছে। এ কারণে অনেকে এ খাতকে আর বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় মনে করছেন না।

বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। পরিবার সঞ্চয়পত্র ছাড়া বাকি সব সঞ্চয়পত্রে ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগ করতে পারে। মেয়াদপূর্তির পর মুনাফার হার ১১ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে থাকে।

সরকার টাকা ধার নিতে পারছে না কেন

চার বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে কোনো ঋণ নিতে পারছে না সরকার। বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে বলা যাক, সরকার সারা বছর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে। সাধারণ মানুষ সেই সঞ্চয়পত্র কেনেন, এতে সরকার কোটি কোটি টাকা আয় করে। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহককে মুনাফা দেয়। এখানেই শেষ নয়; সঞ্চয়পত্র বিক্রির পুরো টাকা সরকার নিতে পারে না।

সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি থেকে সঞ্চয়পত্রের মেয়াদপূর্তি এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভেঙে ফেলা অর্থ পরিশোধ করার পর যা বাকি থাকে, সরকারের দিক থেকে সেটাই হচ্ছে নিট বিক্রি বা নিট ঋণ। চার বছর ধরে সরকারের এ খাত থেকে নিট ঋণ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছিল ২০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের পেশ করা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের ঘাটতি পূরণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য আছে।

চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) নিট বিক্রি হয়েছে ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই ৮ মাসে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, মেয়াদপূর্তি এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভেঙে ফেলার কারণে তার চেয়ে ৫৫৫ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হয়েছে সরকারকে। এর মানে, বাজেটের ঘাটতি পূরণে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে কোনো টাকা নিতে পারছে না। উল্টো বাড়তি টাকা খরচ করে সঞ্চয়পত্রের ভাঙানো টাকার জোগান দিতে হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের চিত্র

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর সম্প্রতি এসব তথ্য জানিয়ে আইআরডি সচিব আবদুর রহমান খানকে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসের বিবরণীসহ অর্থবছরের আট মাসের ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগচিত্র তুলে ধরেছেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রওশন আরা বেগম।

চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তর ও ডাকঘরের মাধ্যমে ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। তবে আগের কেনা সঞ্চয়পত্র পরিশোধ করা হয়েছে ৭ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার। সে হিসাবে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিক্রির চেয়ে পরিশোধ বেশি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে ৬১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। অথচ আগের কেনা সঞ্চয়পত্র পরিশোধ করা হয়েছে ৬১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ কোটি টাকায়।

আগের তিন বছরেও নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল ১৭ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা।

কার লাভ, কার ক্ষতি

বেশি সঞ্চয়পত্র কেনার অর্থ হচ্ছে সরকারের বেশি ঋণ নেওয়া। এ ঋণের বিপরীতে সরকারকে উচ্চ হারে সুদ দিতে হয়। তাই মুনাফার খরচ কমাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই এ খাত থেকে ঋণ কমিয়ে আনতে মুনাফার হার কমানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এতে কিছুটা সফলতা দেখা গেছে। তবে আগের তুলনায় সঞ্চয়পত্র ভাঙানোয় মুনাফা বাবদ বেশি টাকা দিতে হচ্ছে।

আইআরডি সচিব আবদুর রহমান খান বলেন, সঞ্চয়পত্র হোক আর ট্রেজারি বিল–বন্ড হোক, সরকারকে এ দুটি খাতে উচ্চ সুদ গুনতে হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ মোট ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার বড় অংশ সঞ্চয়পত্র ও ট্রেজারি বিল–বন্ডের সুদ হিসেবে রাখা হয়েছে।

আবার এর ভিন্ন চিত্রও আছে। বাজেট–ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে কম টাকা পাওয়া গেলে বিকল্প উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে সহজ পথ হলো ব্যাংকঋণ। সম্প্রতি সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ঋণ নিয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে হয়েছে।

ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ঋণ কম পান। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থান কম হয়, ব্যবসা–বাণিজ্য শ্লথ হয়।