২০২৬-২৭ বাজেটে তামাকপণ্যের মূল্য ও কর কাঠামো সংস্কারের জোরালো প্রস্তাব
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের কর ও মূল্য কাঠামোতে বড় রকমের পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স (আত্মা)। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সিগারেটের মূল্যস্তরের সংখ্যা কমিয়ে সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতি প্রবর্তন এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে তামাকের ব্যবহার ও অকাল মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি, সরকারের রাজস্ব আয়ও ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে দাবি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত মূল প্রস্তাবসমূহ
সোমবার (২০ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সভাকক্ষে আয়োজিত একটি প্রাক-বাজেট সংবাদ সম্মেলনে এই বাজেট প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়। প্রজ্ঞার হেড অব প্রোগ্রামস হাসান শাহরিয়ার বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। সম্মেলনে সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে প্রতি ১০ শলাকার খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। উচ্চ স্তরের সিগারেটের জন্য ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের জন্য ২০০ টাকা বা তার বেশি মূল্য প্রস্তাবিত হয়েছে।
এছাড়াও, বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তামাক কর ও মূল্য বিষয়ক এই বাজেট প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “বর্তমানে সিগারেট ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের ভোক্তা। এই দুই স্তর একত্রিত করে মূল্যস্তরের সংখ্যা চারটি থেকে তিনটিতে নামিয়ে আনা হলে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধূমপানে বিশেষভাবে নিরুৎসাহিত হবে।”
অন্যান্য তামাকপণ্যের জন্য প্রস্তাবিত কর ও মূল্য কাঠামো
সংবাদ সম্মেলনে ২০ শলাকা ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির জন্য অভিন্ন দাম ও করহার যথাক্রমে ৩০ টাকা ও ৫০ শতাংশ আরোপের প্রস্তাব করা হয়। জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ গ্রামের খুচরা মূল্য ৬০ টাকা ও ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব তামাকপণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার দাবি জানানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক এই প্রস্তাবের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সিগারেট কর কাঠামোয় প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি বাড়তি রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ওপর বিদ্যমান চাপ মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হবে।” সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট আয়েশা সুহায়মা রব যোগ করেন, “তামাকপণ্যে সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলে তামাক কর ব্যবস্থা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।”
প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সুফল
সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয় যে, তামাকবিরোধীদের কর ও মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে তামাক খাত থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব হবে। এটি বর্তমান অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপ প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হবেন এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবেন।
আত্মার কো-কনভেনর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের হেড অব অনলাইন (বাংলা) মনির হোসেন লিটন, আত্মার কনভেনর মতুর্জা হায়দার লিটন, কো-কনভেনর মিজান চৌধুরী এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।
বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের বর্তমান চিত্র ও প্রভাব
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাক ব্যবহারজনিত কারণে প্রায় ২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। তবে পক্ষান্তরে, তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপর তামাকের নেতিবাচক প্রভাবও হ্রাস পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।



