জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরও সরবরাহ সংকট: সরকারের নিষেধাজ্ঞা ও ভোগান্তি চলছে
তেলের দাম বাড়লেও সরবরাহ সংকট, ভোগান্তি অব্যাহত

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরও সরবরাহ সংকটে জনদুর্ভোগ

গত কয়েকদিনে তেল সংকটের আতঙ্কে দেশজুড়ে তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। সরকার ২ লিটারের বেশি তেল না দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা দিলেও পেট্রল বা অকটেনের সরবরাহ পাম্প থেকে ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন রাস্তা, খুলনা সহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কিনতে হচ্ছে।

দাম বাড়লেও সরবরাহ বাড়েনি

ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর পরও মানুষের ভোগান্তি কমেনি। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ বাড়বে কি? জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মজুত মোটামুটি ভালো। সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিপিসির অধীন কোম্পানিগুলোকে অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং পেট্রল ও ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ করে বাড়াতে বলা হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে রোববার রাতে তেল সরবরাহকারী কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাকে চিঠি দেওয়া হয়। ফিলিং স্টেশনগুলো সোমবার থেকেই বাড়তি পরিমাণে তেল পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এখনো অনেক স্থানে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও সরকারের ভর্তুকি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ চালানোর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। দামও বাড়তে থাকে। সরকার মার্চে তেলের দাম বাড়ায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে দাম না বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।

১৬ এপ্রিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও আমরা জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে এখন পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত নিইনি। এ খাতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার চেষ্টা করছে আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দাম সমন্বয় ও মন্ত্রীর ব্যাখ্যা

সাধারণত প্রতি মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। কিন্তু মাস শেষ হওয়ার আগে সরকার গত শনিবার দিবাগত রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করে। অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়।

বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে দেশেও সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা করতে বাধ্য হয়েছি আমরা; কারণ, এটা বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনতে হয়। তাই দাম কিছুটা বাড়িয়ে যাতে সহনীয় জায়গায় থাকতে পারি, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, বাড়তি দামে আমদানি করে মজুত তৈরি করা হয়েছে। এতে যে বাড়তি খরচ হয়েছে, তার থেকে কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে এখন।

বিপিসির মুনাফা ও বর্তমান অবস্থা

জ্বালানি তেল বিক্রি করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি নিট মুনাফা করেছে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে মুনাফা। এক দশকের মধ্যে ৯ বছরই মুনাফা করেছে বিপিসি। এর মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে তারা লোকসান করে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বিপিসি সূত্র বলছে, এ বছরের প্রথম ৮ মাসেও ১ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে বিপিসি। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে তাদের ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো লোকসান হয়েছে। এপ্রিলে লোকসান আরও বাড়তে পারে। তাই ঘাটতি কমাতে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন দামে বিপিসির মাসে বাড়তি আয় হতে পারে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল থেকে আসবে ৬০০ কোটি টাকার মতো।

মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে ডিজেলের মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার টন। আগামী দুই সপ্তাহে ৪ লাখ ৭৮ হাজার টন ডিজেল মজুতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি জাহাজে ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল দেশে পৌঁছেছে।

ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের মধ্যে আগের বছরের তুলনায় গত মাসে ডিজেলের সরবরাহ কমানো হয় ১০ শতাংশ। এপ্রিলে কমেছে ৬ শতাংশ। এখন সরবরাহ বাড়াচ্ছে বিপিসি। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, পেট্রলপাম্প থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসছে। গত বছর একই দিনে তারা যতটুকু তেল নিয়েছে, এবারও তা দেওয়ার কথা। যদিও এপ্রিলে সরবরাহ কমে গেছে।

বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই। অকটেন মজুত করার সক্ষমতা আছে ৪৫ হাজার ৮১৯ টন। ১৭ এপ্রিল বিক্রির পর অকটেন মজুত আছে ২৯ হাজার ৪৮৪ টন। গত শুক্রবার ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ এসেছে। এটি খালাস করা হলে সক্ষমতার বেশি হবে মজুত। দেশীয় উৎস থেকেও প্রতিদিন অকটেন উৎপাদন হচ্ছে।

এদিকে গত বছরের তুলনায় এবার মার্চে দিনে গড়ে অকটেনের সরবরাহ বেড়েছে ২৬ টন। তবে গত বছরের তুলনায় এবার এপ্রিলে সরবরাহ কমেছে ৫৬ টন। এখন অকটেন সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতামত

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দাম বাড়ানো সরকারের নিরুপায় উদ্যোগ। দেড় মাস তারা দাম বাড়ায়নি। বাড়তি খরচ মেটানোর চেষ্টা করেছে। যদিও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না। সরকারি বাড়তি খরচের চাপ কিছুটা প্রশমন করতে পারে।

সর্বোপরি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখনো চলছে। সরকার ও বিপিসির পদক্ষেপ সত্ত্বেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।