ভোরে ঘুম ভাঙার পর শামসুল কবিরের প্রথম কাজ কল খুলে দেখা, পানি এসেছে কি না। এরপর ট্যাংকের দিকে চোখ। কতটুকু পানি আছে, তার হিসাব মেলান। তারপর সিদ্ধান্ত নেন, আজও কি পানি কিনতে হবে। চট্টগ্রাম নগরের ফয়’স লেক এলাকার আবদুল হামিদ সড়কের বাসিন্দা শামসুল কবিরের দিন শুরু হয় এভাবেই। তাঁর পাঁচতলা ভবনে ১০টি পরিবার থাকে। প্রায় পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রাম ওয়াসার সংযোগ নিয়েছিলেন। নিয়মিত বিলও দেন। কিন্তু গত তিন মাসে ওয়াসার লাইনে মাত্র দুই দিন পানি পেয়েছেন বলে দাবি তাঁর।
পানির জন্য হাহাকার
ক্ষোভ নিয়ে শামসুল কবির বলেন, এলাকায় পানি এখন সোনার হরিণ। সংযোগ আছে, কিন্তু পানি নেই। মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকার পানি কিনতে হয়। ওয়াসার পানি না পেয়ে তাঁদের নির্ভর করতে হয় বেসরকারি গভীর নলকূপের ওপর। এলাকার কিছু ব্যক্তি নিজেদের নলকূপের পানি বিক্রি করেন। এক ঘণ্টা মোটর চালিয়ে পানি নিলে দিতে হয় প্রায় তিন হাজার টাকা।
ফয়’স লেক চট্টগ্রামের অন্যতম পরিচিত এলাকা। এক পাশে পাহাড় ও হ্রদ। এখানে রয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা। নগরের গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় বহু মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপদ পানি।
শামসুল কবির একা নন। ফয়’স লেক, খুলশী ও আশপাশের পাহাড়ঘেরা এলাকায় গত কয়েক সপ্তাহে ২৫ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রায় সবার অভিযোগ একই। সংযোগ আছে, কিন্তু পানি নেই। কেউ সপ্তাহে এক দিন পানি পান। কেউ মাসে এক দিনও পান না।
এক লাখ মানুষের দুর্ভোগ
জানতে চাইলে আবদুল হামিদ সড়ক প্লট মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নুরুচ্ছফা বলেন, তাঁদের সমিতিতে ১১২ জন সদস্য আছেন। প্রায় সবাই ওয়াসার সংযোগ নিয়েছেন। কিন্তু হাতে গোনা ১০ থেকে ১২ জন নিয়মিত পানি পান। অন্যরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে আছেন। তাঁর দাবি, ফয়’স লেক ও আশপাশের এলাকায় অন্তত এক লাখ মানুষ পানিসংকটে ভুগছেন। এ জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কয়েকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। ওয়াসার প্রকৌশলীরা এসে এলাকাটি পরিদর্শনও করেছেন; কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।
বাড়তি খরচে নাকাল
পানির জন্য বাড়তি খরচ ফয়’স লেক এলাকার বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম প্রতি মাসে নিয়মিত ৬৫০ টাকা করে ওয়াসার বিল দেন। কিন্তু সেই পানির দেখা মেলে খুব কমই। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘লাইন চার্জ বাবদ মাস শেষে বিল দিচ্ছি, কিন্তু পানি পাই না এক দিনও। অনেক সময় কল খুললে শুধু বাতাস বের হয়। তখন মনে হয়, আমি শহরে বসবাস করি নাকি কোনো দুর্গম গ্রামে থাকি।’
পানির সংকট শুধু ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বাড়াচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয়ও। আগে যে পরিবারগুলো কয়েক শ টাকার বিল দিয়ে চলত, এখন তাদের অনেককে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। বাসিন্দারা জানান, পানির ট্যাংকার, বেসরকারি নলকূপ কিংবা বিকল্প সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে অনেক পরিবারের মাসিক ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। পরিবারভেদে প্রতি মাসে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। বহুতল ভবনগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে
একসময় ওয়াসার পানি না পেলে গভীর নলকূপ ছিল ভরসা। এখন সেই ভরসাতেও ফাটল ধরছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও নলকূপ মালিকদের দাবি, গত কয়েক বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে গেছে। আগে তুলনামূলক কম গভীরতায় পানি মিললেও এখন অনেক স্থানে ৪০০ ফুট গভীর নলকূপেও পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, পাহাড় কাটা, দ্রুত নগরায়ণ, জলাধার ও প্রাকৃতিক জল ধারণ এলাকা কমে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতার কারণে চট্টগ্রামে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। ফয়’স লেক ও আশপাশের এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি সেই সতর্কবার্তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
সংকট নিরসনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও চলছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. মাকসুদ আলম বলেন, ফয়’স লেক ও আশপাশের এলাকায় দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। মদুনাঘাট পানি শোধনাগার থেকে এই এলাকায় পানি সরবরাহ করা হয়। এটি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় উচ্চতার কারণে কিছু সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে দিনে ২০ থেকে ২৫ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। নিচের অংশের গ্রাহকেরা আগে পানি নিয়ে নেওয়ায় ওপরের অংশের অনেক গ্রাহক পানি পান না।
সমাধানের পথে?
মাকসুদ আলম জানান, সংকট নিরসনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এটি বাস্তবায়িত হলে ফয়’স লেকসহ আশপাশের এলাকার পানিসংকট দূর হবে বলে আশা করছে ওয়াসা। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়া প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ফয়’স লেক ও আশপাশের এলাকার পানিসংকট নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে মানুষ একই অভিযোগ করে আসছেন। এখনো নিয়মিতভাবে তাঁর কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ আসে। তিনি বলেন, সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই মানুষ ভোগান্তিতে আছেন; কিন্তু ওয়াসা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। পরিকল্পিতভাবে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলে আজ এত মানুষকে পানি কিনে ব্যবহার করতে হতো না।



