দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ‘নবম জাতীয় বেতন কাঠামো’ বা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করায় সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী কল্যাণ সমিতি’। তবে এই পে-স্কেল ধাপে ধাপে বা কিস্তিতে বাস্তবায়ন না করে আগামী ১ জুলাই থেকেই প্রথম ধাপে এককালীন শতভাগ (১০০%) মূল বেতন বা বেসিক কার্যকর করার জোরালো দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি
রোববার (৩১ মে) সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবদুল মালেক এবং সদস্য সচিব আশিকুল ইসলামের যৌথ স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই আলটিমেটাম ও যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরা হয়। নেতাদের মতে, দীর্ঘ এক দশকে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হওয়ায় নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে এবং বহু কর্মচারী বাঁচার তাগিদে চাকরির ফাঁকে বাড়তি কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা একটি স্বাধীন দেশের প্রশাসনের জন্য চরম লজ্জাজনক।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের গুঞ্জন
কল্যাণ সমিতির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে যে, নতুন পে-স্কেলটি আগামী তিন বছরে মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে; যার প্রথম ধাপে ১ জুলাই থেকে বেসিকের ৫০ শতাংশ দেওয়া হতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি, তথাপি এই গুঞ্জন যদি সত্যি হয় এবং ৫০ শতাংশ বেসিক দেওয়ার সাথে সাথেই যদি বর্তমানে চালু থাকা ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বা ভাতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তবে তা হবে একটি চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
অংকের হিসাব
নেতারা অংক কষে দেখান, ১৫ শতাংশ সমন্বয়ের পর একজন নিম্ন গ্রেডের (১১ থেকে ২০তম গ্রেড) কর্মচারীর যে সামান্য টাকা বেতন বাড়বে, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে এক সপ্তাহের বাজার করাও সম্ভব হবে না। এর ফলে পে-স্কেল দেওয়ার পরও কর্মচারীদের ঘরের অভাব একই থেকে যাবে, অথচ বাজারে নতুন পে-স্কেলের অজুহাতে জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে; যা কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করবে।
বিকল্প প্রস্তাব
সব গ্রেডের প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং লাখ লাখ কর্মচারীর জীবনমান সচল রাখার স্বার্থে সংগঠনটি সরকারের কাছে একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছে। তারা বলেন, সরকার চাইলে প্রথম ধাপেই শতভাগ বেসিক কার্যকর করে সেখানে বর্তমানের ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতা সফলভাবে সমন্বয় বা কাটছাঁট করতে পারে। এরপর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বাজেট বিবেচনা করে অন্যান্য ভাতাগুলোকে পরবর্তী দুই বছরে দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যেহেতু সরকারি ভাতার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে বাসাভাড়া, তাই দ্বিতীয় ধাপে বাসাভাড়া এবং তৃতীয় ও শেষ ধাপে চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে রাষ্ট্রের ওপর এককালীন বড় অর্থনৈতিক চাপ পড়বে না, আবার কর্মচারীরাও ক্ষুব্ধ না হয়ে সানন্দে তা মেনে নেবে।
ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও দ্রব্যমূল্যের বিপর্যয় রোধ
কল্যাণ সমিতির নেতারা একটি বড় ভীতি প্রকাশ করে বলেন, সাধারণত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটি পে-স্কেলের সুফল ভোগ করেন মাত্র ৫ বছর। সেখানে দীর্ঘ ১১ বছর পর নবম পে-স্কেল দিতে এসে তা যদি আবার তিন বছর ধরে ধাপে ধাপে ঝুলে থাকে, তবে পরবর্তী পে-স্কেলের জন্য কত যুগ অপেক্ষা করতে হবে—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, তিন বছর ধরে পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর নতুন ধাপকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় কৃত্রিম উপায়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মরণকামড় দেওয়ার সুযোগ পাবে। অল্প সময়ে বা এককালীন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে বাজারে এই কারসাজি করার সুযোগ কম থাকে। ধাপে ধাপে এগোলে এক পর্যায়ে বর্ধিত বেতনের চেয়ে দ্রব্যমূল্যের দাম কয়েক গুণ বেশি হয়ে যাবে, যার ফলে বেতন ও খরচের সামঞ্জস্য হারিয়ে সরকারি কর্মচারীরা আবারও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত হবেন। এই মানবিক ও যৌক্তিক বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার জন্য তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।



