ফেনী সদরে মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল থেকেই বিভিন্ন এটিএম বুথের সামনে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কারও হাতে ব্যাংকের চেক, কারও হাতে এটিএম কার্ড। কেউ কোরবানির পশু কিনতে টাকা তুলতে এসেছেন, কেউ আবার স্বজনের চিকিৎসার খরচ জোগাতে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও বেশিরভাগ মানুষকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। বুথের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে— ‘টাকা নেই’।
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চরম ভোগান্তি
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ফেনীতে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনে চরম ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। নগদ অর্থ সংকট, সীমিত লেনদেন ও এটিএম বুথে টাকা না থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে কারিগরি সমস্যার কথা বলছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ
ফেনী শহরের মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীন জানান, তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ফেনী শাখা থেকে কোরবানির গরু কেনার জন্য ৫ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে কয়েক দিন ধরে ঘুরছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকে নিজের জমানো টাকা থাকলেও প্রয়োজনের সময় পাচ্ছি না। ঈদের আগে পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
মহিপাল এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুন অভিযোগ করেন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ফেনী শাখায় গিয়ে তিনি চাহিদামতো টাকা পাননি। তার ভাষ্য, ব্যবসার জন্য নগদ টাকা দরকার। কিন্তু প্রতিদিন সীমিত টাকা দিচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
সোনাগাজীর চরচান্দিয়া এলাকার প্রবাসী পরিবারের সদস্য রুবেল হোসেন অভিযোগ করেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সোনাগাজী শাখা থেকে বিদেশ থেকে পাঠানো সঞ্চয়ের টাকা তুলতে গিয়ে তিনি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তিনি বলেন, বাবার চিকিৎসা আর কোরবানির খরচের জন্য টাকা দরকার। কিন্তু ব্যাংকে গেলে শুধু পরে আসতে বলে।
ফেনী শহরের রামপুর এলাকার গৃহিণী রাশেদা আক্তার অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন ব্যাংকের ফেনী শাখায় টাকা তুলতে গিয়ে তিনি একাধিকবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, স্বামীর চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকা প্রয়োজন। অথচ নিজের জমা টাকা তুলতেই পারছি না।
দাগনভূঞার ইয়াকুবপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নুরুল আফসার অভিযোগ করেন, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের দাগনভূঞা শাখা থেকে দোকানের মালামাল কেনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারেননি।
ছাগলনাইয়ার পাঠাননগর এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. হানিফ অভিযোগ করেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের ফেনী শাখা থেকে অবসরভাতার টাকা তুলতে গিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন। তার ভাষ্য, ঈদ, চিকিৎসা আর সংসার– সব মিলিয়ে খুব সংকটে আছি। নিজের টাকাই সময়মতো তুলতে পারছি না।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত গ্রাহকচাপ ও কেন্দ্রীয় নগদ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ফেনী শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঈদের আগে চাপ অনেক বেড়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিমাণ টাকা বিতরণ করা হচ্ছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ফেনী শাখার ব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা চেষ্টা করছি। গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানাচ্ছি।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, তারল্য সংকট কিছুটা রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উন্নতির চেষ্টা চলছে।
ইউনিয়ন ব্যাংক ফেনী শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে আগে থেকে আবেদন করতে বলা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঈদের আগে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। অনেক পরিবার কোরবানি দেওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছে।



