কোরবানির ঈদের আর মাত্র দুই দিন বাকি। এই সময়ে কোরবানির পশু কেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকে। অন্যদিকে মসলার বাজারেও ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। বিভিন্ন ধরনের মসলা পণ্যের মধ্যে বর্তমানে ছোট এলাচ, আদা, লবঙ্গ, দারুচিনি, বাদাম, দেশি পেঁয়াজ, শুকনা মরিচের দাম বাড়তি রয়েছে। মসলার পাশাপাশি বাজারে আগের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে মুরগির ডিম, বিভিন্ন ধরনের মাছ, খাসির মাংস, শসা ও টমেটো। চিনিগুঁড়া বা পোলাও চালের দাম আগে থেকেই বাড়তি। তবে সেমাই, নুডলসের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
মসলার দাম বৃদ্ধির কারণ
মসলার আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল থেকে বেশির ভাগ মসলা আমদানি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের কারণে মসলা আমদানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামও কমবেশি বেড়েছে। এসব কারণে বর্তমানে দেশে আমদানি করা বিভিন্ন মসলার দাম কিছুটা বাড়তি রয়েছে।
ছোট এলাচের দাম
মসলার বাজারে সবচেয়ে দামি পণ্য ছোট এলাচ। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ছোট এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। গত এক মাসের মধ্যে এলাচের দাম সেভাবে বাড়েনি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার এলাচের দাম কেজিতে ৪০০-৬০০ টাকা বেশি রয়েছে।
পেঁয়াজ, আদা, শুকনা মরিচের দাম
বাজারে পেঁয়াজের দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫৫ টাকায়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, গত এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। যদিও গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এখন পেঁয়াজের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ কম। টিসিবির হিসাবের চেয়ে কিছুটা বেশি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বর্তমানে প্রতি কেজি আদা বিক্রি হচ্ছে ২০০-২৫০ টাকায়। গত এক মাসের মধ্যে পণ্যটির দাম ৮ শতাংশ বেড়েছে। দেড় মাসের মধ্যে শুকনা মরিচের দাম কেজিতে ১০০ টাকার ওপরে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি শুকনা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৬০ টাকায়। এ ছাড়া লবঙ্গের দাম কেজিতে ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে।
বাদামের দামে ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ইরান যুদ্ধের কারণে বড় প্রভাব পড়েছে আলু বোখারা ও পেস্তাবাদামের দামে। পণ্য দুটির বেশির ভাগ আমদানি হয় ইরান থেকে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি কেজি আলু বোখারার দাম ছিল ৫০০ টাকার আশপাশে। বর্তমানে এই দাম বেড়ে ১ হাজার ২৫০ টাকা হয়েছে। অন্যদিকে পেস্তাবাদামের দাম কেজিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা হয়েছে। এ ছাড়া কাঠবাদামের দামও কেজিতে ১০০ টাকার মতো বেড়েছে।
অন্যান্য মসলার দাম
অন্যান্য মসলার মধ্যে জিরা ৫০০-৬০০ টাকা, কিশমিশ ৭৫০-৮৫০ টাকা, তেজপাতা ১৪০-২০০ টাকা, দারুচিনি ৪৫০-৫২০ টাকা, জয়ফল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, জয়ত্রী ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় জিরা, রসুন, ধনে ও তেজপাতার দাম কম রয়েছে।
মসলা বিক্রেতার প্রতিক্রিয়া
ঈদের আগে মসলা বেচাকেনা কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, ঈদের পাঁচ-ছয় দিন আগে থেকে মসলার বিক্রি বেড়েছে। মোটামুটি ভালো বেচাকেনা চলছে। তবে বাজারে কোরবানির গরু বেচাকেনা বেশি হলে মসলার চাহিদাও বাড়তে থাকে।
সেমাই, চিনির দাম স্থিতিশীল
ঈদের সময় বাসাবাড়িতে কমবেশি সেমাই, পায়েস, পোলাও রান্না হয়। এসব পণ্যের মধ্যে সেমাই, চিনি, দুধের দাম গতকাল পর্যন্ত মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রাম ওজনের মোড়কজাত সেমাই বিক্রি হয়। প্রতি প্যাকেটের দাম ৪৫-৫০ টাকা। একই পরিমাণ খোলা সেমাই ৩০-৩৫ টাকায় কেনা যায়। বাজারে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১০০ টাকা ও মোড়কজাত চিনি ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি গুঁড়া দুধ বিক্রি হচ্ছে ৭০০-৯০০ টাকায়।
চলতি বছরের শুরু থেকে চিনিগুঁড়া বা পোলাও চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। দফায় দফায় দাম বাড়তে বাড়তে তা কেজিপ্রতি ১৪০-১৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। বর্তমানেও এ দামে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে। অবশ্য অন্যান্য চালের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল।
ডিম, মাছ, টমেটো, মরিচের দাম বাড়তি
কোরবানির ঈদের সময় সাধারণত ব্রয়লার মুরগি, মুরগির ডিম ও মাছের চাহিদা কমে যায়। তবে চাহিদা কম থাকলেও সরবরাহ ঘাটতি থাকায় এসব পণ্যের দাম কিছুটা বাড়তি রয়েছে। বর্তমানে ফার্মের মুরগির প্রতি ডজন ডিম ১৩০-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে এ দাম আরও ১০ টাকা বেশি ছিল। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০ টাকা কেজি দরে। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের মাছের দামও বাড়ছে। যেমন গতকাল সোমবার রাজধানীতে ২ কেজি আকারের রুই মাছ ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে এই আকারের রুইয়ের কেজি ছিল ৩৬০-৩৭০ টাকা। এভাবে অন্যান্য মাছের দামও ৩০-৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ ছাড়া গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল থাকলেও খাসির মাংসের দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে।
বাজারে বিভিন্ন সবজির দাম অবশ্য কমতির দিকে। গতকাল বেশির ভাগ সবজি বিক্রি হয়েছে ৪০-৬০ টাকার মধ্যে। তবে শসা, গাজর, কাঁচা মরিচ ও টমেটোর দাম কিছুটা বেড়েছে। এর মধ্যে মরিচের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৮০-১০০ টাকা হয়েছে। প্রতি কেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকায়। টমেটো বিক্রি হয় ১০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ৮০ টাকা ছিল।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের সবজি বিক্রেতা আল-নাহিয়ান বলেন, ঈদের সময় সবজির চাহিদা কিছুটা কম থাকে। তবে এ সময় সালাদের জন্য শসা, গাজর, কাঁচা মরিচ ও টমেটোর চাহিদা বাড়ে। তাই এসব পণ্যের দাম কিছুটা বাড়তি রয়েছে।



