গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে ঈদ উৎসবের আগে ও পরে, উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে টিকিটের প্রাপ্তি। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় এই সংক্রান্ত পাঠকের অভিমত প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা কিংবা বগুড়ার অধিবাসীরা জীবিকার তাগিদে, চিকিৎসার্থে কিংবা শিক্ষার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াত করে থাকেন; কিন্তু উৎসবের সময় এই জনপদের সাধারণ যাত্রীদের জন্য বাস ও ট্রেনের একটি টিকিট সংগ্রহ করা যেন যুদ্ধজয়ের সমতুল্য হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ভোগান্তি
প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটেছে সত্য; কিন্তু টিকিট বিক্রির আধুনিক অনলাইন ব্যবস্থা এখন সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির পরিবর্তে চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ সময়েও এই সমস্যা কমবেশি দেখা যায়। তবে ঈদ, পূজা বা অন্য কোনো বড় ছুটির মৌসুমে এই সংকট মহামারির রূপ ধারণ করে। টিকিট বিক্রয় শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই অনলাইন সার্ভার থেকে প্রায় সব টিকিট অদৃশ্য হয়ে যায়। অথচ তার পরমুহূর্তেই একই টিকিট বিভিন্ন কালোবাজারি, দালাল ও অননুমোদিত মাধ্যমে দ্বিগুণ-তিনগুণ মূল্যে বিক্রয় হতে দেখা যায়।
উত্তরবঙ্গের ট্রেন ও বাস
'পঞ্চগড় এক্সপ্রেস', 'একতা এক্সপ্রেস', 'দ্রুতযান এক্সপ্রেস' কিংবা 'নীলসাগর এক্সপ্রেস'-এর মতো ট্রেনগুলি উত্তরবঙ্গের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অনলাইন টিকিট ব্যবস্থার কারিগরি দুর্বলতা, সার্ভারে প্রবেশে জটিলতা, পেমেন্ট আটকে যাওয়া এবং টাকা কেটে নেওয়ার পরেও টিকিট নিশ্চিত না হওয়ার মতো বিবিধ ত্রুটিবিচ্যুতি যাত্রীদের চরম বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অল্পশিক্ষিত মানুষ এই প্রযুক্তির ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। কেবল ট্রেন নয়, দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রেও একই বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বিদ্যমান। অনলাইনে প্রদর্শিত ভাড়ার সাথে কাউন্টারের ভাড়ার বিস্তর গরমিল লক্ষ করা যায়। ছুটির দিনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ও যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব
তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এই সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু চক্র নানাবিধ গুজব ছড়িয়ে টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। অথচ গণ-পরিবহন কেবল কোনো বাণিজ্যিক মাধ্যম নয়, এটি মানুষের জীবন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থার এই অব্যবস্থাপনা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিক অধিকারের পরিপন্থি।
সমাধানের পথ
এই সংকট থেকে উত্তরবঙ্গের মানুষকে মুক্তি দিতে প্রশাসনকে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সার্ভারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর চাপ সামলানোর জন্য অনলাইন সার্ভারকে করতে হবে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক। দ্বিতীয়ত, কালোবাজারি দমন করতে হবে। দালাল চক্র ও অবৈধ টিকিট বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে শাস্তির ব্যবস্থা করা ছাড়া বিকল্প নেই। তৃতীয়ত, গ্রামাঞ্চলের মানুষের সুবিধার জন্য সহজ ভাষায় অনলাইন টিকিট ক্রয়ের নির্দেশিকা ও প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, প্রতিটি রেল স্টেশন ও বাস কাউন্টারে সার্বক্ষণিক তথ্যকেন্দ্র চালু রাখতে হবে, যাতে কোন টিকিট কতটি অবিক্রীত রয়েছে, তা প্রকাশ্য থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, কর্তৃপক্ষ যদি এই বিষয়ে আন্তরিক না হন, তাহলে উত্তরবঙ্গের মানুষের এই নিয়তি-নির্ধারিত যাতায়াত ভোগান্তি কখনো দূর হবে না। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট মহল অবিলম্বে এই টিকিট সংকটের সমাধানে সচেষ্ট হবেন। এই সময় চাহিদা অনুযায়ী গণ-পরিবহনের সংখ্যা কীভাবে বাড়ানো যায় এবং সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়—তা ভেবে দেখতে হবে।



