ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসির গণশুনানি
ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসির গণশুনানি

ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ শুনানির আয়োজন করা হয়। শুনানিতে ভোক্তা প্রতিনিধিরা দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেন।

প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিইআরসির অনুমোদন বাধ্যতামূলক

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, এখন থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যেকোনো প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর আগে বিইআরসিতে পাঠাতে হবে। তিনি বলেন, 'সব সংস্থা ও কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে এটা জানানো হয়েছে। আগের কমিশন এটা করেনি।' তিনি আরও বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের কারণেই ভর্তুকি বেড়েছে এবং জাতির ক্ষতি হয়েছে। অথচ কোনো বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বিইআরসি দেখে দেয়নি।

প্রকল্পের খরচ ভোক্তার কাছ থেকে নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালে চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সংস্থা হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়, পরে সেই খরচ সমন্বয় করতে বিইআরসির কাছে আসে, কিন্তু কমিশন প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছয় বিতরণ সংস্থার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

শুনানিতে ছয়টি বিতরণ সংস্থা তাদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এর মধ্যে পিডিবি গড়ে ৩.২৪ শতাংশ, আরইবি গড়ে ৫.৯৩ শতাংশ, ডিপিডিসি গড়ে ৬.৯৬ শতাংশ, ডেসকো গড়ে ৯.৬৭ শতাংশ, ওজোপাডিকো সাড়ে ৯ শতাংশ এবং নেসকো সাড়ে ১৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে।

ছয়টি বিতরণ সংস্থা বিদ্যমান পাইকারি দাম ধরে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, পাইকারি দাম ও সঞ্চালন চার্জ বাড়লে আনুপাতিক হারে তাদেরও দাম বাড়াতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কারিগরি কমিটির সুপারিশ

বিইআরসি গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি দাম বাড়ানোর পক্ষে সুপারিশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে পিডিবির ঘাটতি হতে পারে ৭৫ পয়সা, আরইবির ১ টাকা ৩৯ পয়সা, ডিপিডিসির ১ টাকা ১৮ পয়সা, ডেসকোর ১ টাকা ১৬ পয়সা, ওজোপাডিকোর ১ টাকা ৩৩ পয়সা এবং নেসকোর ১ টাকা ৪৩ পয়সা। এ ঘাটতি মেটাতে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ বাড়াতে হবে, যার ফলে প্রতি ইউনিটে বাড়বে ১ টাকা ২৫ পয়সা।

আবাসিক গ্রাহকদের ধাপ (স্ল্যাব) পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে কোনো সুপারিশ করেনি কারিগরি কমিটি। তারা বলেছে, ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য প্রথম ধাপ তুলে দিলে গ্রাহকের বিল বেড়ে যাবে, যা কমিশন বিবেচনা করবে। এ ছাড়া গ্রাহকের লোড পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া যাবে না। কাঠামোগত পরিবর্তন হঠাৎ করা যায় না; গবেষণা করে গ্রাহকের ওপর প্রভাব যাচাই করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিক করার প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি বলেছে, সরকারি বা বেসরকারি যাই হোক, এগুলোকে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে, বাণিজ্যিক করা যাবে না। দাম বাড়ানো হলে বাড়তি বিল তারা মানুষের কাছ থেকেই আদায় করবে।

ভোক্তা ও নাগরিক সমাজের বিরোধিতা

দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। লিখিত বক্তব্যে তারা দাম না বাড়ানোর দাবি জানায়। তারা বলেছে, দাম বাড়ানো হলে মাসের খরচ বাড়বে, একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে, তাদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স)। তিনি বলেন, 'বিদ্যুৎ সাংবিধানিক অধিকার। এটি সেবা খাত, লাভজনক বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের পকেট কেটে টাকা নেওয়ার নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে পিডিবি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বোবা কান্না দেখার কেউ নেই, ধাপ বদল করে আরও টাকা নিতে চায়। এমন প্রস্তাব যারা দেয়, তাদের মধ্যে জনস্বার্থ নেই। তাই দাম বাড়ানোর প্রস্তাবটাই অনৈতিক।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, 'কী কী করলে বিদ্যুতের দাম কমানো যেতে পারে, এ পরিকল্পনা কেন নেই। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়। ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর কথা বলে না।' ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, 'সরকার যেন মুনাফাখোর না হয়, সেটাই জনগণের প্রত্যাশা। কল্যাণের অর্থনীতি থেকে বিবেচনা করলেও বিদ্যুতের দাম কমানো যায়। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বর্জন করেছে ভোক্তা।'

সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, 'দেশের প্রধানমন্ত্রী মানুষকে স্বস্তি দিতে চান, আর এখানে হচ্ছে উল্টোটা। সরকার মুনাফাভোগী হতে পারে না, ব্যবসা করতে পারে না। বিইআরসির আইন সংশোধন করতে হবে। লুটপাটের বাংলাদেশ থেকে বের হতে হবে। দাম কমানোর গণশুনানি করতে হবে।'

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সাত দফা দাবি লিখিতভাবে জমা দিয়েছে কমিশনের কাছে। এতে বলা হয়, ভারী শিল্প বিশেষ করে স্টিল মিলগুলোকে সচল রাখতে কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না। ২০২০ সাল থেকে স্টিল খাতে অচলাবস্থা চলছে; এখন দাম বাড়ালে এ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের অলস বসে থাকার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, তা ধাপে ধাপে পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।

শুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সবার মতামত, প্রস্তাব, পরামর্শ বিবেচনায় নিয়েই কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে অবশ্যই ভোক্তার স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে।