গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ দাম বাড়ানোর পক্ষে বিতরণ কোম্পানিগুলোর হিসাব
গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ দাম বাড়ানোর পক্ষে বিতরণ কোম্পানির হিসাব

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পর এবার গ্রাহক পর্যায়েও দাম বৃদ্ধির পক্ষে নিজেদের আর্থিক ঘাটতির হিসাব তুলে ধরেছে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে পিডিবি, আরইবি, ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো ও নেসকো দাবি করেছে— বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যয়, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে তাদের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। ফলে বর্তমান ট্যারিফে সেবা চালিয়ে গেলে বড় অঙ্কের ঘাটতিতে পড়তে হবে বলে জানিয়েছেন তারা। তবে তাদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন ভোক্তাদের প্রতিনিধিরা।

পিডিবির ঘাটতি প্রতি ইউনিটে ২৯ পয়সা

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গণশুনানিতে জানিয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ট্যারিফ বজায় থাকলে তাদের প্রতি ইউনিটে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াবে ২৯ পয়সা। বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে— পিডিবি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ১ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে পারবে ১৪৫২ কোটি টাকা। এতে তার ঘাটতি থাকবে ৮৩ কোটি টাকা। এরসঙ্গে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়লে অনুপাতিক হারে ব্যয় বাড়বে। সেই ব্যয়ও সমন্বয় করতে বলছেন তারা। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর মাত্র ৪০ দিন বাকি আছে।

পল্লী বিদ্যুতের ৫.৯৩ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব

বর্তমান পাইকারি দামেই পল্লী বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি লোকসান হচ্ছে ৫০ পয়সা। তারা বলছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা হলেও তা ৯ টাকা করতে হবে। এতে গড়ে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে আরইবি। মূল্যায়ন কমিটি বলছে, আরইবি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনবে কিন্তু রাজস্ব আদায় করবে ৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। এতে লোকসান হবে ৪৯৫ কোটি টাকা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিপিডিসির চলতি অর্থবছরের ঘাটতি ৬৫ কোটি

রাজধানীর একাংশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তাদের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও বর্তমান পরিচালন ব্যয়ের কারণে তাদের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি থেকে যাবে। তবে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে, তারা চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ১৯২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিপরীতে রাজস্ব আদায় করবে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এতে তাদের ঘাটতি থাকবে ৬৫ কোটি টাকা।

দাম না বাড়ালে আগামী অর্থবছরে ডেসকোর ক্ষতি হবে ৯৩৪ কোটি

ঢাকা শহরের উত্তরাঞ্চল ও মিরপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ডেসকো জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত তিন বছরে তাদের মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। তারা বলছে আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) তাদের ঘাটতি বেড়ে দাড়াবে ৯৩৪ কোটি টাকায়। মূল্যায়ন কমিটি বলছে— চলতি অর্থবছরে ডেসকো এখনও ৭৮৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিপরীতে ৭৪০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করবে। এতে তাদের ৪৩ কোটি টাকার ঘাটতি থাকবে।

ওজোপাডিকোর প্রতি ইউনিটে ঘাটতি ৮৫ পয়সা

দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকো জানিয়েছে, বিগত দিনগুলোতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই তুলনায় খুচরা পর্যায়ের ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণে তাদের ৮৫ পয়সারও বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বিইআরসি মূল্যায়ন কমিটি বলছে— কোম্পানিটি চলতি বর্থবছরে ৪১৯ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে ৪৫২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনতে হবে। এতে তাদের ঘাটতি হবে ৩৩ কোটি টাকা।

নেসকোরও ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের আবেদন

উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি নেসকো জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার বিতরণ ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের নিজস্ব বিতরণ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৬৬ পয়সায় গিয়ে পৌঁছাবে। বিইআরসি বলছে— চলতি অর্থবছরে ৫৩৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনলেও তারা রাজস্ব আদায় করতে পারবে ৯৪৬ কোটি টাকার। এতে ঘাটতি থাকবে ৪১ কোটি টাকা।

শুনানির প্রস্তাবে বিতরণ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে তাদের পরিচালন ব্যয় রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। এই বিশাল ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এর আগে বুধবার পিডিবির প্রস্তাবিত পাইকারি বিদ্যুতের দাম নিয়ে গণশুনানি করেছে কমিশন।