ভোক্তা বা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়ানোর প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির দেওয়া মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শুরু করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ বলে আখ্যা দিচ্ছে অনেকে।
গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে বয়কট করেছে ভোক্তারা। তারা এই প্রস্তাবকে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার উদ্যোগ হিসেবে মনে করছেন। আইন সংশোধনের মাধ্যমে অবিলম্বে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য বিইআরসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ভোক্তারা।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ভোক্তারা এই আহ্বান জানান। শুনানির শুরুতেই কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) লিখিত সুপারিশে এই কথা জানান বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
ক্যাবের বক্তব্য
ক্যাব জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা তার পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না, তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো উচিত নয়। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বাড়াবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো জনজীবনে চাপ সৃষ্টি করবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও অপচয় কমিয়ে ব্যয় হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস ও বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করে ভোক্তা-বান্ধব ও বাস্তবসম্মত মূল্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, “সরকারকে মুনাফাখোর হিসেবে দেখানো যাবে না। এই মুনাফার নামে জনগণের ভোগান্তি বাড়ানো যাবে না।” বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব সবার বয়কট করা উচিত বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা করার চেয়ে দাম কমিয়ে কীভাবে এই ভর্তুকি কমানো যায় সেই আলোচনা করা জরুরি।” বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মানেই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার উদ্যোগ উল্লেখ করে এই নেতা বলেন, “এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে দেওয়া যাবে না।”
কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য
শুনানির শেষে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্পগুলো যেন বিইআরসির মাধ্যমে যেন যায় সে জন্য সব কোম্পানিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সব পিপিএ বিইআরসি দেখে দিলে দায় কমিশনেরও থাকতো। প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা আনতে এটা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “সবার মতামতের ভিত্তিতে গণশুনানি ফলপ্রসূ হয়েছে। কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন শেষে এই প্রস্তাবিত দামের উপর কমিশন তার আদেশ জানাবে।”
অন্যান্য বক্তব্য
শুনানিতে আরও বক্তব্য রাখেন নাগরিক সমাজের মো. মহিউদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবুন্নেসা, অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, স্টিল মিল অ্যাসোসিয়েশনের জাহাঙ্গীর আলম, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির জাকির হোসেন নয়ন, সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফারহান নুরসহ আরও অনেকে।



