ভাঙা ডিমের বাজার: দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের পুষ্টি সংকট
ভাঙা ডিমের বাজার: দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের পুষ্টি সংকট

সম্প্রতি প্রথম আলোয় প্রকাশিত সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া বাজারের ডিমের পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন আমার নজরে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে যে বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে, তা দিন দিন সাধারণ মানুষের জন্য কতটা নির্মম হয়ে উঠছে, এটি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমসহ সব ধরনের ডিমের দাম এতটাই আকাশছোঁয়া যে স্বল্প আয়ের মানুষেরা এখন দোকানে দোকানে ‘ভাঙা ডিম’ খুঁজছেন। একটি ডিমের দাম শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের পুষ্টি, শিশুর স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা এবং একজন দিনমজুরের সাধ্যের লড়াই। অথচ পুরো বাজারব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের দিকটা খুব কমই ভাবা হয়।

ভাঙা ডিমের দাম বাড়ছে

প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাজারে ভালো ডিমের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙা ডিমের দামও বেড়ে গেছে। কিছুদিন আগেও যে ভাঙা ডিম বিক্রেতারা নিজেদের খাওয়ার জন্য বাড়ি নিয়ে যেতেন বা পাঁচ-ছয় টাকায় বিক্রি করতেন, চাহিদার সুযোগে এখন তা আট টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্য দিকে ভালো ফার্মের ডিমের হালি ৫০ টাকা ছুঁয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে কিছুটা সাশ্রয়ের আশায় মানুষ ভাঙা ডিমের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় ক্রেতার পকেটের ওপর যে চাপ পড়ছে, তা চরম হতাশাজনক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বাজার অস্থিরতা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য বড় একটি মানসিক সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে মফস্‌সল বা গ্রামীণ এলাকার মানুষের জন্য প্রোটিনের সবচেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা উৎস হলো ডিম। মাছ-মাংসের চড়া দামের কারণে যখন ডিমই ছিল একমাত্র ভরসা, তখন সেটির দামও এখন নাগালের বাইরে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে আসা এক মায়ের আকুতি—‘মেয়ের ভাতের সঙ্গে ডিম ভাজা হলে আর কিছু লাগে না, তাই ভাঙা ডিম কিনছি’—আমাদের পুরো বাজারব্যবস্থার অসহায়ত্বকে ফুটিয়ে তোলে। ক্রেতাদের আচরণ ও সামাজিক সংকোচ নিয়েও একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক দিক আছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেকেই আত্মসম্মানের ভয়ে পরিচয় প্রকাশ না করে গোপনে বা সংকোচ নিয়ে ভাঙা ডিম কিনতে আসছেন। সমাজে ভাঙা ডিম কেনাকে একধরনে অভাবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে মানুষ বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নিচ্ছেন, অথচ একজন মানুষের পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার অধিকার অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। আরেকটি সাধারণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি। ভাঙা বা ফেটে যাওয়া ডিমের খোসা দিয়ে খুব সহজেই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করতে পারে, যা পেটের অসুখ বা ফুড পয়জনিংয়ের কারণ হতে পারে। অর্থাৎ পেটের তাগিদে সস্তায় প্রোটিন কিনতে গিয়ে মানুষ অজান্তেই বড় ধরনের রোগব্যাধিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, বিশেষ করে শিশুরা চরম পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে পড়বে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিক্রেতারাও সংকটে

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। ডিমের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিক্রেতারাও সংকটে পড়েছেন। বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় তাঁদের প্রতিদিনের আয় কমে গেছে। অথচ অনেক সময় পুরো দোষ গিয়ে পড়ে এই খুচরা বিক্রেতাদের ওপর, যাঁরা নিজেরাও আসলে এই পরিস্থিতির শিকার। সমাধান অবশ্যই সম্ভব। প্রশাসন ও বাজার মনিটরিং কমিটি চাইলেই নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ ছাড়া খামারিদের জন্য পোলট্রি ফিডের দাম কমানো বা তীব্র তাপপ্রবাহে মুরগি রক্ষায় সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যায়। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং বাজারের অস্থিরতা দূর হবে। ভালো উদাহরণও তৈরি করা সম্ভব, যদি সরকার ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে ডিমের একটি সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় এবং তা কঠোরভাবে কার্যকর করে।

ডিম সস্তা হওয়া বা না–হওয়া সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বড় বিষয়। একটি ভালো বাজারব্যবস্থা শুধু মুনাফা লোটে না, মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদার প্রতিও সম্মান দেখায়। কারণ, খাদ্যপণ্য শুধু ব্যবসার উপাদান নয়, এটি মানুষের জীবন, পরিবার, স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।