সুন্দরবনে মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম চললেও থেমে নেই মৎস্য নিধন। নিষিদ্ধ বিষ প্রয়োগ, পাটা জাল এবং লোহার শিক ব্যবহার করে অবাধে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করছেন একশ্রেণির অসাধু জেলে। বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে প্রজনন মৌসুমে বন প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও বাস্তবতা
সুন্দরবনের মৎস্য ভাণ্ডারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত—এই তিন মাস বনে মাছ ও কাঁকড়া শিকার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সময় পর্যটন ও জেলেদের পাস-পারমিটও বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের একটি চক্র বন বিভাগের কিছু অসাধু সদস্যকে উৎকোচ দিয়ে অবাধে বনে প্রবেশ করছে।
উৎকোচের বিনিময়ে অবৈধ প্রবেশ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানান, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার গোনে বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট হারে উৎকোচ দিয়ে তারা বনে মাছ শিকার করছেন। জাল ও শিকারের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে উৎকোচের টাকার অঙ্ক নির্ধারিত হয়। টাকা দিলে বনে মাছ শিকার ‘বৈধ’, আর না দিলে তাদের নামে মামলা দিয়ে আদালতে চালান দেওয়া হয়।
নিষিদ্ধ বিষ প্রয়োগ ও সুন্দরী গাছ নিধন
অভিযোগ রয়েছে, বনের গহীনে মাছ ধরার সময় নিষিদ্ধ বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা মাছের পোনা ও জলজ প্রাণীর জন্য ভয়াবহ হুমকি। এছাড়া কাঁকড়া ধরার জন্য নদীর চরে আটন বসাতে গিয়ে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে সুন্দরী গাছের চারা।
বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ
ফিশ ফার্ম অনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব) ও খুলনা কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান সাহীন বলেন, “প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া নিধন বন্ধ না হলে অচিরেই এই প্রাকৃতিক সম্পদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বন বিভাগকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। কেবল অভিযান নয়, অবৈধ শিকারিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনা এবং বন বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
বন বিভাগের বক্তব্য
এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “প্রজনন মৌসুমে বন প্রবেশ ও মাছ ধরা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিছু জেলে যে লুকিয়ে বনে প্রবেশ করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আগের চেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি এবং বেশ কিছু নৌকাও আটক করা হয়েছে। আমাদের বন বিভাগের কোনো সদস্য জড়িত থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”



