বান্দরবানে রাংগোয়াই আমের বাম্পার ফলন, ক্রেতার অভাবে পচে নষ্ট হচ্ছে হাজার মণ
রাংগোয়াই আম পচে নষ্ট, বাগানিরা লোকসানের মুখে

বান্দরবান সদর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলার রোয়াংছড়ি-রুমা সড়কের দুর্গম চান্দাপাড়ায় ১২ একর জমিতে আমের বাগান করেছিলেন বাগানি আতুইমং মারমা। তাঁর বাগানের দুই হাজার গাছে স্থানীয় জাতের রাংগোয়াই আমের ফলন এসেছে। প্রায় অর্ধেক গাছের আম পেকেও গেছে। কিন্তু পাইকারি ব্যবসায়ীরা কেনার আগ্রহ দেখাননি। এ কারণে গাছ থেকে পাকা আম মাটিতে ঝরে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। আম বিক্রি না হওয়ায় আতুইমং মারমা বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন।

আম ঝরে পড়ে পচে যাচ্ছে

গত শনিবার চান্দাপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, আতুইমং মারমার বাগানে গাছের নিচে স্তূপ হয়ে আছে পাকা আম। ঝরে পড়া আম দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দাম বাড়বে, ব্যবসায়ী আসবে আশায় বসেছিলাম। এখন প্রায় দেড় হাজার মণ আম এভাবে পচে গেছে।’

শুধু আতুইমং নন, রাংগোয়াই আম চাষ করে লোকসান গুনছেন তাঁর মতো কয়েক শ বাগানি। রোয়াংছড়ির চুয়ানলুপাড়ার পলাশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাও তাঁদের একজন। তিনি জানান, তাঁর পাঁচ একরের রাংগোয়াই আমের বাগানের ছয়-সাত শত মণ আম হতো। ইতিমধ্যে অর্ধেকের বেশি ঝরে পড়ে গেছে। আম্রপালি ও বারি আমের দাম কম হলেও মোটামুটি বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় জাতের রাংগোয়াই আম বিক্রি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা কিনতে চাইলেও মণে সাড়ে চার শ থেকে পাঁচ শ টাকার বেশি দিচ্ছেন না। এই দামে বিক্রি করলে গাছ থেকে আম আহরণ ও সড়ক পর্যন্ত বহনের খরচও পাওয়া যায় না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিক্রি না হওয়ায় চরম লোকসান

রোয়াংছড়ি-রুমা সড়কের চুয়ানলুপাড়া বমপাড়া, দুর্নীবারপাড়া, খামতাং খেয়াংপাড়া, থোয়াইবতং মারমাপাড়া, চান্দাপাড়া, সেপ্রুপাড়ার আমবাগান ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। বাগানিদের সবার একই কথা, রাংগোয়াই আম বিক্রি হচ্ছে না। আমের মৌসুমের শেষের দিকে দাম না বাড়লে শত শত একরের হাজার মণ আম পচে নষ্ট হয়ে যাবে। বাগানিরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

থোয়াইবতংপাড়ার ক্যসাপ্রু মারমা জেলা শহরের বাজারে নিয়ে খুচরা বিক্রির জন্য বস্তায় রাংগোয়াই আম ভরছিলেন। তিনি বলেন, হাটবারে খুচরা বিক্রি করলে প্রতি কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু শত শত মণ আম খুচরা বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই বাগানেই অধিকাংশ আম পচে যাচ্ছে।

কাঁচা আমের দাম বেশি

তবে বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি সড়কের চিম্বুক পাহাড়ের ম্রোরা জানান, রাংগোয়াই আম মৌসুমের শুরুতে কাঁচা অবস্থায় ভালো দামে বিক্রি হয়। পরে মৌসুম শেষে বাজারে সব আম শেষ হয়ে গেলে দাম বেশি পাওয়া যায়। কাঁচা রাংগোয়াই আম আচার কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে মণপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দাম পাওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ২৫ হাজার ৮৬০ একর জমিতে আম চাষ হয়। এর মধ্যে চাষের ৬০ শতাংশই স্থানীয় প্রজাতির রাংগোয়াই আম। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া এই আম চাষের জন্য ভালো হওয়ায় চাষিরা বেশি চাষ করেন।

পরিবহন ও বাজারজাতকরণে সমস্যা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার দূরবর্তী এলাকাগুলোতে ফল ব্যবসায়ীরা সহজে যেতে চান না। এ কারণে অনেক ফল নষ্ট হয়ে যায়। রুমার আম ব্যবসায়ী মো. ইসহাক ও ইলিয়াস বলেছেন, বড় বাজারে বর্তমানে রাংগোয়াইয়ের দাম মণপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। বাগানে ৫০০ টাকায় কিনলে গাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য খরচ দিয়ে পোশায় না। আবার আরও কম দামে নিতে চাইলে বাগানিদের পক্ষে বিক্রি সম্ভব হয় না।

অন্যান্য কী খরচ দিতে হয় জানতে চাইলে দুই আম ব্যবসায়ী বলেন, তিন টনের এক ট্রাক ফল নিতে গেলে পথে পথে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা খরচ দিতে হয়। এ কারণে তাঁরা বাগানিদের কাছে আরও কম টাকায় ফলের দাম দিতে বাধ্য হন।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেছেন, রাংগোয়াই আম স্বাদে হালকা টক হওয়ায় ভোক্তাদের কাছে অন্যান্য আমের চেয়ে কদর কম। তবে ভালো দিক হলো অন্যান্য আম শেষ হওয়ার পরও রাংগোয়াই আম গাছে পাওয়া যায়। তখন দাম বাড়ে। এবারও শেষের দিকে দাম বাড়বে।