নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় একটি লেয়ার মুরগির খামারের বর্জ্যের দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়েছে। এতে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই খামারের বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে রাখায় একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতির মুখে পড়ছে ফসলি জমি ও কৃষি উৎপাদন। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও রহস্যজনক কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাদের।
খামারের অবস্থান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র
স্থানীয়দের অভিযোগ এবং সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে চাঁদখানা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদখানা চরকবন চারমাথা এলাকায় কয়েক বছর আগে নর্থ পোল্ট্রি (প্রা.) লিমিটেড নামে একটি লেয়ার খামার গড়ে তোলা হয়। পাশ দিয়ে চলে গেছে চরকবন চারমাথা থেকে মাগুড়া ইউনিয়নের পারের হাটে যাওয়ার পাকা সড়ক। সড়কের পাশের খামার-সংলগ্ন একটি পুকুরে লেয়ার মুরগির বিষ্ঠা ভাসতে দেখা যায়। খামারের ভেতরে আরও একটি বাউন্ডারিঘেরা খোলা স্থানে বিপুল পরিমাণ বিষ্ঠা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেখানে তীব্র দুর্গন্ধের কারণে দীর্ঘ সময় অবস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
খামারের পাশের জমিতে কাজ করা কৃষক তোফায়েল মিয়া বলেন, "বিষ্ঠার দুর্গন্ধে এখানে কাজ করাই কষ্টকর। কিন্তু জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে জমিতে কাজ করছি।" আগে এই সড়ক দিয়ে চাঁদখানা ও মাগুড়া ইউনিয়নের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের হাজারো মানুষ চলাচল করতেন। এখন দুর্গন্ধের কারণে অনেকেই এই পথ এড়িয়ে চলেন। খামারের ভেতরের সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়, অটোরিকশায় থাকা নারী ও শিশুরা মুখে ওড়না পেঁচিয়ে দুর্গন্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। চাঁদখানা ছয়আনী গ্রামের বাসিন্দা তহুজা বেগম বলেন, "এই পথ ব্যবহার করলে সহজে পারেরহাটে যাওয়া যায়। কিন্তু দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র যে মুখ ঢেকেও সহ্য করা যায় না।" মাগুড়া ইউনিয়নের পারেরহাট গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "পারেরহাট, চরকবন, ডাঙ্গাপাড়া, চারমাথা ও সিংগেরগাড়ী গ্রামের হাজারো মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করতেন। এখন সড়কের দুই পাশে খামারের বিষ্ঠা ফেলে রাখায় এটি কার্যত খামারের দখলে চলে গেছে।"
প্রশাসনের কাছে অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
খামারের আশপাশের বাসিন্দাদের দাবি, দুর্গন্ধে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ থানা, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নর্থ পোল্ট্রি (প্রা.) লিমিটেডের ম্যানেজার সিরাজ মিয়া দুর্গন্ধের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, "খামারে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার লেয়ার মুরগি রয়েছে। প্রতিদিন এসব মুরগি থেকে দুই থেকে তিন টন বিষ্ঠা উৎপন্ন হয়। বর্ষাকালে বিষ্ঠার গন্ধ কিছুটা বেশি হয়। দুর্গন্ধ কমাতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও কম্পোস্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ চলছে। এগুলো চালু হলে সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।"
জনপ্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
চাঁদখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (যাদু মিয়া) বলেন, "খামারের দুর্গন্ধে কয়েক হাজার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।" উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নীল রতন দেব বলেন, "লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির বিষ্ঠায় সালমোনেলা ও ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার-জাতীয় জীবাণু থাকতে পারে, যা ডায়রিয়া, বমি ও জ্বরের কারণ হতে পারে। এছাড়া বিষ্ঠায় জন্ম নেওয়া হিস্টোপ্লাজমা ছত্রাক শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।" উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হাকিম বলেন, "দুর্গন্ধের কারণে কৃষকরা স্বাভাবিকভাবে জমিতে কাজ করতে পারছেন না। এতে ফসলের পরিচর্যা ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।"
প্রশাসনের বক্তব্য
কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফর রহমান বলেন, "এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, "বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। এখন খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"



