বগুড়ার বাজারে আলুর দাম বাড়লেও কৃষকরা লাভের মুখ দেখতে পারছেন না। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির অজুহাতে হিমাগার মালিকরা আলু সংরক্ষণ ভাড়া প্রতি বস্তা ৩৮০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা ধার্য করেছেন। তবে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা প্রতি বস্তার ভাড়া ৩০০ টাকার বেশি দিতে রাজি নন। আর ভাড়া কমানো না হলে গত বছরের মতো তাদের লোকসান গুনতে হবে।
হিমাগার ভাড়া নিয়ে সংঘাত
এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে হিমাগার মালিক ও আলুচাষি-ব্যবসায়ীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পাল্টা সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বগুড়া কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, এ জেলায় চলতি মৌসুমে ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।
আলুর দাম ও ক্ষতি
এ মৌসুমে আলুর দাম কেজি প্রতি আট টাকা থেকে ১০ টাকায় নেমে আসে। এরপর কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে প্রায় দুই লাখ টন আলু পচে যায়। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যায়। এতে বর্তমানে আলুর দাম বেড়ে প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছর এ সময়ে আলুর দাম ছিল গড়ে ২০ টাকা কেজি।
হিমাগার সক্ষমতা ও ভাড়া
জেলায় ৪৮টি হিমাগারে প্রায় পৌনে চার লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদিত আলুর একটি বড় অংশ নষ্ট হওয়ায় এবার হিমাগারে তিন লাখ টনের বেশি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে গত বছর প্রতি বস্তা (৬৫ কেজি) আলু সংরক্ষণ ভাড়া ছিল ৩০০ টাকা। এবার জেলার বিভিন্ন হিমাগারে ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে হিমাগার মালিকরা বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য, শ্রমিক মজুরি ও পরিচলন ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। মহাস্থানে আগমনী হিমাগারে প্রতি বস্তা ৪০০ টাকা এবং এরুলিয়ায় আফরিন কোল্ড স্টোরেজে ৩৮০ টাকা ভাড়া নিচ্ছে।
হিমাগার মালিকের বক্তব্য
আফরিন কোল্ড স্টোরেজের মালিক খলিলুর রহমান জানান, ১ জুন থেকে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বস্তা প্রতি ভাড়া ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই ভাড়া বৃদ্ধি না করলে তাদের লোকসান গুনতে হবে।
কৃষকদের দাবি
বগুড়ার মহাস্থানের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, তারা স্বল্প পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেন। ভাড়া বেশি ধরলে তাদের উৎপাদন খরচই ওঠে না। তাই প্রতি বস্তা আলুর ভাড়া ৩০০ টাকার মধ্যে রাখতে হবে। শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক এলাকার কৃষক সিরাজুল হক জানান, বৃষ্টিতে প্রায় ১৫০ মণ আলু নষ্ট হয়েছে। তিনি যে হিমাগারে আলু রাখতে পেরেছেন, সেখানে ভাড়া প্রতি বস্তা ৪০০ টাকা করে। এতে বাজারে আলুর বিক্রি দাম বাড়লেও লাভ হবে না।
ব্যবসায়ী সমিতির অভিযোগ
বগুড়া জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম অভিযোগ করে বলেন, কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে প্রকৃত খরচ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। এরপরও কোথাও ৩৫০ টাকা আবার কোথায় ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
হিমাগার মালিক সমিতির বক্তব্য
বগুড়া জেলা কোল্ড স্টোরেজ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। আর সেই অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ভাড়া কমালে হিমাগার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকারি উদ্যোগ
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বগুড়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই একটি সিদ্ধান্ত হবে। এরপর হিমাগারগুলো কত ভাড়া নিতে পারবে, সেই বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে।



