চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক ও দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইনের মাঝে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকার ফাঁকা জায়গাটিতে এখন সবার বাড়তি নজর। ১৩ জুন এখানেই ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এখানে তাঁর হাতে রোপণ করা হয় একটি তেলি গর্জনের চারা—যে গাছ এখন আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত।
চারার নিরাপত্তায় বাঁশের বেড়া ও পাহারা
দুই সপ্তাহ পর সরেজমিনে দেখা গেছে, চারাটির সুরক্ষায় দেওয়া হয়েছে বাঁশের বেড়া, বসানো হয়েছে পরিচিতিফলক, এমনকি রাখা হয়েছে রাতের পাহারার ব্যবস্থাও। শুধু এই একটি চারাই নয়, আশপাশে রোপণ করা দুই হাজার দেশীয় প্রজাতির চারার পরিচর্যাতেও চলছে বিশেষ উদ্যোগ।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় মালুমঘাট এলাকায় ১০ প্রজাতির দুই হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়। এর মধ্যে আছে ঢাকিজাম, জাম, চাপালিশ, দারমারা, চম্পা, নিম, সিভিট, বৈলাম, ছাতিয়ান ও তেলসুর। এখানে প্রধানমন্ত্রী তেলি গর্জনের চারা রোপণ করেছেন।
তেলি গর্জনের গুরুত্ব ও ঝুঁকি
গর্জনের তিন প্রজাতির মধ্যে তেলি গর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। এটি মূলত উষ্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চির সবুজ বা আধা সবুজ বনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, তেলি গর্জন দেশের অন্যতম উঁচু বৃক্ষ। উচ্চতায় এ গাছ ৩৫ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ায় এ গাছ পাওয়া যায়।
অনিমেষ বিশ্বাস আরও বলেন, তেলি গর্জন পাহাড়ি এলাকায় মাটির ক্ষয়রোধে ভূমিকা রাখে। দেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের ক্ষয়িষ্ণু বনে তেলি গর্জন জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। তবে শক্ত ও টেকসই কাঠের কারণে পাচারকারীদের হাতে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে কাটার শিকার হয়েছে তেলি গর্জন। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন এই প্রজাতিটিকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
বন অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, কক্সবাজার অঞ্চলে শনাক্ত মা গাছের সংখ্যা ৫ হাজার ৫২০টি। এর মধ্যে গর্জন গাছ রয়েছে ৪ হাজার ৬৮টি।
নাগলিঙ্গম চারাও রোপণ
একই সফরে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শনে গিয়ে একটি দুর্লভ নাগলিঙ্গমের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। অধ্যাপক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, নাগলিঙ্গম বড় আকারের শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ। এর ফুল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ফল হাতির প্রিয় খাদ্য।
গাছের প্রজাতিবিষয়ক বৈশ্বিক ওয়েবসাইট প্ল্যান্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড অনলাইনের তথ্য অনুযায়ী, নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। পরে এটি বাংলাদেশ, হাইতি, হন্ডুরাস ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রমিকদের তত্ত্বাবধান ও নিরাপত্তা
এলাকাটিতে মানুষের চলাচল ও গবাদিপশুর আনাগোনা থাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। একটি আমগাছের ওপর তৈরি করা হয়েছে মাচা, যেখান থেকে রাতে গাছ পাহারা দেওয়া হয়।
এখানে কথা হয় শ্রমিক আবুল হোছেনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার পর থেকে আমরা এখানে চারাগুলোর যত্ন নিচ্ছি। কেউ যেন এসব চারার কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য দিনে–রাতে পালাক্রমে পাহারাও দিচ্ছি। গাছের ওপর মাচা করে রাতে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
আরেক শ্রমিক নুরুল ইসলাম বলেন, এখানে মানুষের চলাচল আছে। আশপাশ দিয়ে গরু-ছাগলের পাল চলাচল করে। একটি চারাও যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে কারণে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর রোপণ করা চারাসহ মালুমঘাটে রোপণ করা সব চারার পরিচর্যা ও নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে নিয়মিত পরিচর্যাও করা হচ্ছে।
দেশীয় প্রজাতিতে সরকারের অগ্রাধিকার
দীর্ঘদিন ধরে আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাসের মতো বিদেশি প্রজাতির গাছ দ্রুতবর্ধনশীল হওয়ায় ব্যাপকভাবে লাগানো হয়েছিল। কাঠের চাহিদা মেটানোসহ প্রাকৃতিক বনের ওপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট গত শতকের আশির দশকে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির চারার পরীক্ষামূলক রোপণ শুরু করে।
উদ্ভিদবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, এসব গাছে কাঠের চাহিদা মেটে। তবে এসব গাছ অতিরিক্ত পানি শোষণ করে, মাটির গুণাগুণ কমিয়ে দেয়। গরু-ছাগল এসব গাছের পাতা খায় না।
বিদেশি প্রজাতির আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাসের দাপটে দেশীয় প্রজাতির গাছের বৈচিত্র্য কমেছে দেশে। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ দুটি প্রজাতির রোপণ নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় দ্রুতবর্ধনশীল মেহগনি, গামার, জারুল, জীবন, কদম, আগর ও বাঁশের পাশাপাশি শিলকড়ই, জাম, মহুয়া, বহেরা, অর্জুন, নিম, হরীতকী, কাঁঠাল ও চালতার মতো গাছ বেশি রোপণ করা হবে। এ ছাড়া আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে এক লাখ নিমগাছ রোপণের পরিকল্পনা আছে সরকারের। উপকূলে ঝাউ এবং সুন্দরবন অঞ্চলে সুন্দরী, গেওয়া, বাইন ও গরান গাছ রোপণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।



