রাঙামাটিতে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার আম নষ্ট হচ্ছে সংরক্ষণের অভাবে
রাঙামাটিতে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার আম নষ্ট

সংরক্ষণের অভাবে রাঙামাটিতে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার আম নষ্ট হচ্ছে। পাকা আম দ্রুত পচে যায়; কিন্তু রাঙামাটিতে দুর্গমতার কারণে সঠিক সময়ে পরিবহণ ও বাজারজাত সম্ভব হয় না। জেলায় কোথাও হিমাগার নেই, গড়ে ওঠেনি কৃষিজাত খাদ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা। ফলে প্রতি বছর আমসহ বিপুল ফলমূল পচে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাম্পার ফলনেও ন্যায্য দাম পান না কৃষক

মৌসুমি ফল উৎপাদনে দেশের পার্বত্য অঞ্চলের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে কাঁঠাল, লিচু ও আনারসের পাশাপাশি এখন বাণিজ্যিকভাবে বাড়ছে আমের উৎপাদন। চলতি মৌসুমে রাঙামাটি জেলায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে, যা ৪০ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে; কিন্তু অধিক ফলন হলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের কপালে ভাঁজ। বিশেষ করে জেলার কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পরিবহণ ও বাজারজাতের সংকটে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না স্থানীয় বাগান মালিক ও কৃষকরা।

হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফলমূল সংরক্ষণের জন্য জেলায় কোথাও গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় হিমাগার ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা। ফলে প্রতি মৌসুমে জেলায় উৎপাদিত কয়েকশ কোটি টাকার আম নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় সঠিক সময়ে পরিবহণ করতে না পারায় বাগানেই বিপুল পরিমাণ আম পচে নষ্ট হয়ে যায়, যা স্থানীয় চাষিদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ। মৌসুমে ভালো ফলন হলেও সংরক্ষণের অভাবে বাগান মালিকরা ন্যায্য দাম পান না। অথচ অধিক ফলনে রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় উৎপাদিত আম বিদেশেও রফতানি শুরু হয়েছে। ঢাকায় চলতি মৌসুমে পাহাড়ের ফলমূল নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে ফলের মেলা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবাদি জমি ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে, যার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার টন। অনুকূল আবহাওয়া ও সঠিক পরিচর্যার কারণে ইতোমধ্যে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হয়েছিল ৩৮ হাজার ২৮৫ টন। ফলন বেশি হওয়ায় রাঙামাটিতে বিদেশি জাতের আম আবাদে ঝুঁকছেন স্থানীয়রা। কমছে দেশি জাতের আমের আবাদ।

বিদেশি জাতের আমের প্রসার

বর্তমানে রাঙামাটিতে রাংগুয়াই (মিয়ানমারের জাত), আম্রপালি (ভারতের জাত), বারি-৪, মিয়াজাকি বা সূর্যডিম, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ব্রুনাই কিং ও কাটিমনের মতো বিশ্বখ্যাত ও দামি বিদেশি জাতের আমের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠছে। তবে দেশি জাতের মধ্যে হাড়িভাঙা আমের আবাদও যথেষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে সুস্বাদু আম্রপালি বাজারের শেষভাগে আসায় এর চাহিদা ও কদর সবচেয়ে বেশি বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা।

বাজারে আমের দাম ও কৃষকের হতাশা

জেলা সদরের বনরুপা সমতাঘাটে গিয়ে দেখা যায়, আমের দাম কম। উৎপাদন বেশি হলেও পরিবহণ সংকট ও সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে না পারায় এ বছর আমের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না বলে জানান বাগান মালিকরা। বর্তমানে স্থানীয় হাটে খুচরা দামে রাংগুয়াই আম ১০০ টাকায় ৪-৫ কেজি পাওয়া যাচ্ছে। আর আম্রপালি পাওয়া যাচ্ছে ১০০ টাকায় ২-৩ কেজি। পাইকারি দাম আরও অনেক কম। তবে ব্যানানা ও সূর্যডিম জাতের আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০-১৫০ টাকায়।

কৃষি বিভাগের উদ্যোগ ও ব্যবসায়ীদের মতামত

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাঙামাটির অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) অরুণ চন্দ্র রায় জানান, পাহাড়ে সাধারণত আম চাষে কেমিক্যাল বা হরমোনের ব্যবহার খুবই সীমিত। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আমগুলো নিরাপদ রাখতে কৃষি বিভাগ ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির সম্প্রসারণ করছে।

পাইকারি আম ব্যবসায়ী মো. জালাল হোসেন বলেন, তিন বছর ধরে রাঙামাটি থেকে আম কিনে বাইরে নিয়ে বিক্রি করছেন। চলতি বছর ৩০ মণ আম কিনেছেন। এবার মৌসুমে রাঙামাটির বাজারে প্রচুর আম আসছে, তাই দামও কিছুটা কমে পাওয়া যাচ্ছে। তবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে স্থানীয় কৃষকরা আমের ভালো দাম পেতেন। আর সরকার বাগানিদের বালাইনাশকে ভর্তুকি দিলে পরিচর্যা খরচ কমত।

কৃষকের বক্তব্য

রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের সুমেত চাকমা বলেন, তিনি গত প্রায় এক দশক ধরে আম চাষ করছেন। তার প্রায় ৫০-৬০ একর জমিতে আমসহ মিশ্রফলের বাগান রয়েছে। এবারও ফলন খুব ভালো হয়েছে, তবে দাম নিয়ে হতাশ তিনি। আম বাজারে নেওয়ার ঝামেলা এড়াতে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বাগানেই বিক্রি করেছেন। তিনি জানান, রাঙামাটির বেশিরভাগ আম বাগান কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক। ওই সব এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ থাকায় পরিবহণ ও বাজারজাতকরণের পাশাপাশি উৎপাদনেও বেশি খরচ হয়। তাই কৃষক অনেকেই বাগানসহ আম বেচে দেন।

বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক কৃষিবিদ পবন কুমার চাকমা বলেন, রাঙামাটিতে আমসহ প্রচুর মৌসুমি ফলের উৎপাদন হয়; কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে এবং পরিবহণ সংকটের কারণে বিপুল ফলমূল পচে নষ্ট হয়ে যায়। কেবল আম নষ্ট হয় কয়েকশ কোটি টাকার। এতে কৃষকদের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাঙামাটির বর্তমান উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, রাঙামাটিতে এখন বিদেশি জাতের আম ব্যাপকহারে আবাদ হচ্ছে। অধিক ফলনে কৃষকরা এতে ঝুঁকছেন। এবার মৌসুমে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে; কিন্তু পরিবহণ ও বাজারজাতের সংকটে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। যদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকত তাহলে তারা ভালো দাম পেতেন। জেলায় কোথাও হিমাগার বা কৃষিজাত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, সংরক্ষণের ব্যবস্থা বা কৃষিজাত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ গড়ে উঠলে পাহাড়ে উৎপাদিত ফলমূল থেকে কৃষকদের পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের উন্নয়ন হতে পারত। তাই তিন পার্বত্য জেলায় উৎপাদিত ফলমূলসহ কৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণে হিমাগার স্থাপনের জন্য আমরা সরকারের কাছে বারবার প্রস্তাবনা দিয়ে আসছি। কেবল সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর আমসহ কোটি কোটি টাকার ফলমূল নষ্ট হয়ে যায়।