উত্তম কৃষিচর্চা: টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত
উত্তম কৃষিচর্চা: টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশে উত্তম কৃষিচর্চা (গ্যাপ) বাস্তবায়নে কৃষক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও ভোক্তাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

‘উত্তম কৃষি চর্চা ও খাদ্য ব্যবস্থা: টেকসই বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে বক্তারা এ কথা বলেন। প্রথম আলো আয়োজিত এই বৈঠকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, হেইফার ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, ইস্পাহানি এগ্রো, গ্রামীণ ডানোন ফুডস, কন্ট্রোল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং কৃষকেরা অংশ নেন।

উত্তম কৃষিচর্চায় অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন, ‘২০২০ সালে নীতিমালা প্রণয়নের পর আমরা দেশে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করি। ২০২৩ সালে মানদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার পর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই উত্তম কৃষিচর্চা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি আমাদের বড় অর্জন। তবে এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে কৃষক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যম—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উত্তম কৃষিচর্চা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি নয়, এটি একটি সম্মিলিত উদ্যোগ।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৫টি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ চলছে। এর মধ্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও হর্টেক্স ফাউন্ডেশন উত্তম কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়ে কাজ করছে। জেলা পর্যায়ে উত্তম কৃষিপণ্যের জন্য বিপণন কর্নার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার কৃষকের বাজারেও উত্তম কৃষিপণ্য বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বড় বিপণিবিতানগুলো যদি এসব পণ্য বাজারজাত করতে এগিয়ে আসে, তাহলে উৎপাদকদের আরও উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।’

কৃষক পরিবারকেন্দ্রিক উদ্যোগ

হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর নূরুন নাহার বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান বিশাল হলেও যাঁদের পরিশ্রমে আমাদের খাদ্য উৎপাদিত হয়, সেই কৃষকেরাই নানা সেবা ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা অনেক কাজ করছে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কৃষকের কাছে আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা পৌঁছে দেওয়া কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের পক্ষে সম্ভব নয়।’

হেইফার বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ, হাঁস-মুরগি ও নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। শুরুতে তারা শুধু নারী কৃষকদের নিয়ে কাজ করত; পরে পুরো কৃষক পরিবারকে সম্পৃক্ত করে। নারী কৃষকদের সমবায়ভিত্তিক সংগঠিত করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি সমবায়ে প্রায় এক হাজার সদস্য রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কৃষক যেন তাঁর উৎপাদিত নিরাপদ পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কৃষক যদি লাভবান না হন, তাহলে তিনি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আগ্রহী হবেন না।’

গবেষণা ও মানদণ্ড বাস্তবায়ন

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক (পুষ্টি) যাকীয়াহ্ রহমান মনি বলেন, ‘খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি ধাপই উত্তম কৃষিচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিএআরসি জাতীয় উত্তম কৃষিচর্চা স্কিমের স্কিমওনার হিসেবে বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চা মানদণ্ড, ফসলভিত্তিক প্রটোকল, পরিচালন নির্দেশিকা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রকাশনা প্রণয়ন করেছে।’ তিনি জানান, পাঁচটি মডিউলের আওতায় প্রশিক্ষণ, নথি সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, পণ্যের গুণগত মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো. আফছার আলী বলেন, ‘উত্তম কৃষিচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুষম সার প্রয়োগ। কৃষকেরা সাধারণত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি ব্যবহার করেন, কিন্তু গন্ধক, দস্তা, বোরন ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো অণুপুষ্টি উপাদান খুব কম ব্যবহার করেন। অথচ অল্প পরিমাণে এসব উপাদান ব্যবহার করলে ফলন ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ভারী ধাতু পরীক্ষার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে জানান, কোনো এলাকায় ভারী ধাতু পাওয়া গেছে—এ ধরনের তথ্য যথাযথ গবেষণা ও একাধিক পরীক্ষার আগে প্রকাশ করা উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক মান ও বাস্তবায়ন

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ন্যাশনাল হর্টিকালচারিস্ট ও গ্যাপ বিশেষজ্ঞ এম নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ ও উত্তম কৃষিচর্চা নীতিমালা ২০২০ নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাজারে সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে নীতিগত অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে এখনো ২৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক ব্যবহার হচ্ছে, যার অনেকগুলো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ।

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার–কৃষি এ কে ওসমান হারুনী বলেন, ‘উত্তম কৃষিচর্চাকে দৈনন্দিন জীবনের একটি ভালো অভ্যাস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এটি শুধু রপ্তানি বাজারের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের নিরাপদ খাদ্যের জন্যও জরুরি।’ তিনি নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আয়তনে ছোট হলেও তারা বিশ্বের অন্যতম বড় কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক। কারণ, তারা গবেষণা, সম্প্রসারণ, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।’

বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা

ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেডের পরিচালক ফৌজিয়া ইয়াসমিন বলেন, ‘কোনো পণ্য উৎপাদনের আগে আমাদের জানতে হয়, বাজারে সেই পণ্যের চাহিদা কতটুকু। উত্তম কৃষিচর্চার ক্ষেত্রেও উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও ভোক্তার চাহিদাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’ তিনি আম নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগের কথা জানান, যেখানে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত আম নিজেদের ব্র্যান্ডে বাজারজাত করে দেখা গেছে, ভোক্তারা প্রিমিয়াম দামে সেই পণ্য কিনতে আগ্রহী।

গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীপেশ নাগ বলেন, ‘গ্রামীণ ডানোন একসময় বাংলাদেশের একমাত্র বি করপোরেশন সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ছিল। এত ব্যয় করে সব মানদণ্ড অনুসরণ করার পরও বাজারে তার প্রতিফলন পাওয়া যায়নি।’ তিনি উত্তম কৃষিচর্চার ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হিসেবে সচেতনতা তৈরি ও তথ্যপ্রাপ্তি বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতা

যশোরের বিজয়নগর কো–অপারেটিভের কৃষক লাবনী খাতুন বলেন, ‘আমি প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক। উত্তম কৃষিচর্চার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করি। মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার, জৈব সার, জৈব বালাইনাশক, হলুদ আঠালো ফাঁদ ও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের চেষ্টা করি। কিন্তু এত পরিশ্রম করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করলেও বাজারে গিয়ে সাধারণ পণ্যের মতো একই দামে বিক্রি করতে হয়।’ তিনি জানান, এখন নিয়মিত সব তথ্য লিখে রাখার চেষ্টা করেন, যাতে প্রকৃত লাভ-লোকসান বোঝা যায়।

সুপারিশ

  • উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে হবে।
  • উত্তম কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য ও আলাদা বাজার নিশ্চিত করা জরুরি।
  • কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাড়ানো দরকার।
  • ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
  • ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ ও শনাক্তযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • সুষম সার, জৈব সার ও নিরাপদ বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়ানো।
  • নারী ও তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
  • গবেষণা, নীতি ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
  • সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা আধুনিক করা প্রয়োজন।