২৫ শতাংশ জমিতে আঙুর চাষে ১০ লাখ টাকা আয়, সফল কৃষক জাহাঙ্গীর
২৫ শতাংশ জমিতে আঙুর চাষে ১০ লাখ টাকা আয়, সফল কৃষক

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কৃষ্ণবাটি গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম (মিন্টু) বিভিন্ন ফসল চাষ করে সংসার চালাতেন। ধীরে ধীরে কিছু জমিজমা কিনলেও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। বসতবাড়ি পাকা করার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে এ বছর মাত্র ২৫ শতাংশ জমিতে আঙুর চাষ করে বাজিমাত করেছেন তিনি। আঙুর ও চারা বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা আয় করেছেন, যা তাঁকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ দেখিয়েছে।

আঙুর চাষে সাফল্য

৫০ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর এখন আঙুর চাষকে ঘিরে বড় স্বপ্ন দেখছেন। নতুন করে ৪৫ শতক জমিতে এই ফলের চাষ সম্প্রসারণ করেছেন। শুধু আঙুর উৎপাদনই নয়, চারা তৈরি করে বিক্রি করছেন। প্রতিটি চারা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের খেত প্রস্তুত করা থেকে ফল উৎপাদন পর্যন্ত পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছেন।

ইউটিউব থেকে শেখা

জাহাঙ্গীরের বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কৃষ্ণবাটি গ্রামে। ১৯৯৫ সালে মাধ্যমিক পাসের পর দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধপথে মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে পুলিশের হাতে আটক হয়ে ছয় মাস কারাগারে কাটিয়ে দেশে ফেরেন। এরপর কৃষিকাজ শুরু করেন। আধুনিক কৃষির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। ইউটিউবে কৃষি ভিডিও দেখে তিনি বাড়ির পাশের ২৫ শতাংশ জমিতে আঙুর চাষ শুরু করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাহাঙ্গীর দুই জাতের আঙুর চাষ করেছেন: বাইকুনুর ও রাশিয়ান একেলো। ইউটিউবে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার যোগীহুদা গ্রামের একটি আঙুরখেতের ভিডিও দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। সেখানে গিয়ে ৩০০ টাকা করে চারা কিনে এনে রোপণ করেন এবং ওই খেতের মালিকের পরামর্শে চাষ শুরু করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খেতের দৃশ্য ও বিক্রি

গত ১ জুন বিকেলে কৃষ্ণবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলের মাঠের মাঝখানে জাল দিয়ে ঘেরা একটি ছোট আঙুরখেত। পিচের রাস্তা থেকে নেমে মাঠের মাঝ দিয়ে মোটরসাইকেল ও হেঁটে দলে দলে মানুষ ছুটছেন ওই খেতের দিকে। খেতের সামনে অন্তত ৫০টি মোটরসাইকেল সারিবদ্ধ। ভেতরে ২০০ থেকে ৩০০ মানুষের ভিড়। কেউ আঙুরের থোকা হাতে ছবি তুলছেন, কেউ ওজন করে আঙুর কিনছেন, কেউ চারা সংগ্রহ করতে এসেছেন, আবার কেউ খেতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। দর্শনার্থীদের জন্য আইসক্রিম, পানি ও পাঁপড় ভাজার দোকান বসেছে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার ২৫ শতাংশ জমির আঙুর গাছের বয়স এক বছর। সাত মাসে গাছে ফল ধরে। ১০ মাস বয়স থেকে ফল পাকা শুরু হয়। ফল পাকা শুরু হলে প্রথমদিকে মাত্র দুই দিন বাজারে নিয়ে বিক্রি করেছি। এরপর আর বাজারে নিতে হয়নি। খেত থেকেই ৪০০ টাকা কেজি দরে ৪১ দিনে সব ফল বিক্রি হয়ে গেছে।’

পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে জাহাঙ্গীরের সংসার। বড় মেয়েকে স্নাতক পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। মেজ মেয়ে যশোর সরকারি মহিলা কলেজে স্নাতকে ভর্তি হয়েছেন। ছোট ছেলে এ বছর মাধ্যমিক পাস করেছে। আগে পাঁচজনের সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো। আঙুর চাষ তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে।

জাহাঙ্গীর জানান, এক বছর না পারতেই তিনি ৭ লাখ টাকার আঙুর ও তিন লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। খরচ হয়েছে তিন লাখ টাকার মতো। লাভ হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। এই টাকা দিয়ে বসতবাড়ির ঘর করার কাজে হাত দেবেন। নতুন করে আরও ৪৫ শতক জমিতে আঙুর চাষ বাড়াবেন।

‘আঙুর বিশেষজ্ঞ’ জাহাঙ্গীর

সফল আঙুরচাষি হিসেবে এখন এলাকায় বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন জাহাঙ্গীর। আশপাশের মানুষ আঙুর চাষের বিষয়ে তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসছেন। এমনকি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও তাঁর কাছ থেকে চাষপদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য নিচ্ছেন। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় দুর্বিষহ বন্দিজীবনের কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে উঠি। তবে এখন জীবনের চাকা ঘোরানোর পথ পেয়ে গেছি।’

আঙুর চাষে জাহাঙ্গীরের সাফল্য দেখে অনেকে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এ বছর অন্তত পাঁচজনের নতুন আঙুর খেত প্রস্তুত করতে সহায়তা করেছেন তিনি। কৃষ্ণবাটি গ্রামসহ আশপাশের তিনটি গ্রামের মাঠে এখন আঙুর চাষ সম্প্রসারণ ঘটেছে। এ বছর নতুন করে ১৪ জন চাষি আঙুর চাষ শুরু করেছেন। মনিরামপুরের পাশাপাশি যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর, ঝিকরগাছা উপজেলার ছুটিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে অন্তত ৩০ জন চাষি আমদানি নির্ভর এই ফল চাষে ঝুঁকেছেন।

জাহাঙ্গীর জানান, আঙুরের চারা তৈরি করেও অনেক টাকা লাভ হচ্ছে। সারা বছর চারা বিক্রি হবে। ইতিমধ্যে অনেকে তাঁর আঙুরখেত দেখে চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার তৈরি চারা নিয়ে আমি অন্তত পাঁচজনের খেত প্রস্তুত করে দিয়েছি। এর মধ্যে বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা গ্রামের হাফিজুর রহমানের ৩৩ শতকের তিন বিঘা, নড়াইলের রূপগঞ্জ এলাকার মিলনের চার বিঘা এবং মনিরামপুর উপজেলার ঘুঘরাইল গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের ১৪ শতক জমিতে আঙুর চাষের জন্য খেত প্রস্তুত করে দিয়েছি।’

জাহাঙ্গীরের ভাই রিপন হোসেনও কৃষ্ণবাটি গ্রামের মাঠে ২০ শতক জমিতে আঙুর চাষ করেছেন। তাঁর খেতে ফলন কিছুটা কম। রিপন হোসেন বলেন, ‘জাহাঙ্গীর ভাইয়ের খেত দেখে আমিও আঙুর চাষ শুরু করি। আমার গাছ একটু দেরিতে রোপণ করা হয়েছে। এ জন্য ফলন কমে গেছে। তবে এখন ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেখে পাশের তিন গ্রামের অন্তত ১৪ জন নতুন করে আঙুর চাষ শুরু করেছেন।’

সম্ভাবনার মাঝে বাধা ‘ডরমেক্স’

আঙুরের এত ভালো ফলনের মাঝেও জাহাঙ্গীর ও রিপন হোসেনদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কারণ, আঙুর চাষে ব্যবহৃত ‘ডরমেক্স’ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ আমদানির সরকারি অনুমোদন নেই। দেশেও এটি উৎপাদিত হয় না। ফলে কৃষকদের চোরাইপথে ভারত থেকে উচ্চমূল্যে ওষুধটি সংগ্রহ করতে হয়।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আঙুর চাষের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমরা মার খেয়ে যাচ্ছি ডরমেক্স ওষুধ সংগ্রহ করতে গিয়ে। এই ওষুধ ছাড়া আঙুর চাষ হবেই না। চোরাই পথে আনার সময়ে এই মূল্যবান ওষুধের দুই-একটি চালানে ভালো কাজ করে না, অর্থাৎ ভেজাল থাকে। আমাদের দাবি, সরকার এই ওষুধ আমদানির অনুমোদন দিক। তাহলে আঙুর আমদানি কমবে, দেশের কৃষক বাঁচবে। মানুষও কম দামে আঙুরের মতো দামি ফল সহজে খেতে পারবে।’

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যশোরের জ্যেষ্ঠ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, ‘আমি নিজে জাহাঙ্গীর ও রিপন হোসেনসহ কয়েকজন আঙুর চাষির খেত পরিদর্শন করেছি। তাঁদের দাবিটি যোৗক্তিক। এই চাষ সংক্রান্ত ওষুধ আমদানির বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাচ্ছি।’