খুটাখালী বনে মাচাং থেকে হাতি হত্যা: ভিলেজার প্রথা ও অস্ত্রের ভূমিকা
মাচাং থেকে হাতি হত্যা: ভিলেজার প্রথা ও অস্ত্রের ভূমিকা

২০২৩ সালের ১১ জুন গভীর রাতে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী সংরক্ষিত বনে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে হাসিনা বেগমের। টর্চলাইট নিয়ে বের হয়ে দেখেন ভিটার এক কোণে কাঁঠালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে গোঙাচ্ছে একটি হাতি। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। কিছুক্ষণ পর হাতিটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে গোঙানির শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে। পরদিন মারা যায় হাতিটি।

স্থানীয়দের বক্তব্যে নতুন তথ্য

খুটাখালী বনের পাশে ৩৫ বছর বয়সী হাসিনা বেগমের সঙ্গে তাঁর ভিটায় দাঁড়িয়ে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ওই দৃশ্যের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আশপাশে আমবাগানে রাতে হাতি নামে। হাতির পালে গুলি চালালে এই হাতি আহত হয়ে মারা যায়। এখানে গত কয়েক বছরে আরও পাঁচ–ছয়টি এমন গুলির ঘটনা ঘটেছে। কারা গুলি করছে হাতিকে? তেমন কাউকে তিনি চেনেন কি না, জানতে চাইলে সরাসরি উত্তর দেননি হাসিনা।

এর উত্তর পাওয়া গেল খুটাখালী বনের পাশে আরেক গ্রামের আবদুল হামিদের কাছ থেকে। তিনি বলেন, ‘হাসিনার স্বামী মো. ইদ্রিস ওই হাতিটাকে গুলি করেছিলেন। তাঁর বাড়ি থেকে আমরা বন্দুক উদ্ধার করেছিলাম। পরে বন বিভাগের করা মামলায় ছয় মাস জেল খাটেন ইদ্রিস।’ তবে হাসিনা বেগম বলেন, ওই রাতে তাঁর স্বামী ঘরে ছিলেন না। ইদ্রিস বাড়িতে না থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাতির করিডর ও হত্যার কারণ

হাসিনা বেগমের ভিটার পাশেই মধুশিয়া গর্জনবন। এখানে হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর (হাতি চলাচলের পথ) আছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের তালিকায় এই করিডর খুটাখালী–মেধাকচ্ছপিয়া নামে পরিচিত। হাতির দল নিয়মিত এ বন দিয়ে যাতায়াত করে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, ধান পাকার মৌসুম এলে এখানে হাতি হত্যা বেড়ে যায়।

আইইউসিএন ২০১৬ সালে সর্বশেষ হাতির সংখ্যা নিয়ে একটি জরিপ চালায়। এতে হাতির সংখ্যা পাওয়া যায় ২৬৮টি। অধিকাংশ হাতির আবাস কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই জরিপের পর হাতিকে ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড’ বা মহাবিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে আইইউসিএন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তদন্ত কমিটির সুপারিশ

কক্সবাজারে হাতি হত্যার কারণ তদন্তে ২০২০ সালের নভেম্বরে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই মাসেই দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হাতি রক্ষায় বন কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব আছে বলে উল্লেখ করা হয়। হাতি রক্ষায় জবরদখলে সংকুচিত হতে থাকা হাতির করিডর উন্মুক্ত রাখা, বিদ্যুতের ফাঁদ অপসারণে টহল বাড়ানো, জনবল বাড়ানো, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন, হাতির খাদ্যোপযোগী বাগান সৃষ্টি, শুষ্ক মৌসুমে হাতির পানির চাহিদা পূরণে বনের ভেতরের জলাধারগুলো সংরক্ষণ, হাতির খাদ্য (যেমন উলু ফুল, ছন, বাঁশ) আহরণ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

মাচাং ও ভিলেজার প্রথা

গত ২০ জুন সরেজমিনে দেখা যায়, খুটাখালী বনের হাজিরঘোনা আর মধুশিয়া গর্জনবনের মাঝখানে বিশাল ধানিজমি। এসব জমির যেখানে যেখানে গাছ আছে, সেসব গাছের ওপর বাঁশ আর ছন দিয়ে তৈরি পাঁচটি মাচাং চোখে পড়ে। দিনের বেলায় মাচাংগুলোতে কাউকে দেখা যায়নি। স্থানীয় লোকজন বলছেন, সন্ধ্যা নামলে এখানে লোকজন বন্দুকসহ অবস্থান নেয়। পাকা ধান পাহারা দিতে এসব মাচাং তৈরি করেন এখানকার কৃষকেরা। এসব কৃষকের অধিকাংশই বন বিভাগের নিবন্ধনভুক্ত ভিলেজার। হাসিনা বেগমের স্বামী ইদ্রিসও একজন ভিলেজার।

এ রকম ভিলেজারদের নিয়ে খুটাখালীতে একটি গ্রাম আছে ভিলেজারপাড়া। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকার বন সংরক্ষণে সহযোগিতার শর্তে গৃহহীনদের বনের ভেতর ২৫ শতক থেকে ২০০ শতক পর্যন্ত জমি বরাদ্দ দেয়। বরাদ্দ নেওয়া গৃহহীনেরাই ভিলেজার হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে তাঁদের পরিবারে সদস্যসংখ্যা বাড়লে তাঁরাও বনের ভেতর বসবাস শুরু করে বনের জমি দখল করেন। তাঁরা বিভিন্ন চাষাবাদ করেন। ফসল রক্ষায় তাঁরাও হাতি হত্যায় জড়িয়ে পড়ছেন।

গুলির ঘটনা ও নথিভুক্তির ফাঁক

বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে কক্সবাজারে গুলিতে মারা গেছে ৯টি হাতি। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সংখ্যা ১৮। খুটাখালীতেই ঘটেছে ৬টির বেশি গুলির ঘটনা। বন বিভাগের নথিতে হাতির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা কম নথিভুক্ত হলেও মাঠপর্যায়ে বন কর্মকর্তা ও হাতির ময়নাতদেন্তর সঙ্গে যুক্ত সার্জনরা দিয়েছেন ভিন্ন চিত্র। হাতির ময়নাতদন্তে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও বন বিভাগের নিজস্ব ভেটেরিনারি সার্জন যৌথভাবে যুক্ত থাকেন। তাঁরা বলছেন, কক্সবাজারে যত হাতি হত্যা করা হয়, ময়নাতদন্তের সময় কমপক্ষে ৭০ শতাংশ হাতিকে তাঁরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পেয়েছেন। একজন ভেটেরিনারি সার্জন কক্সবাজারে ২০টি হাতির ময়নাতদন্তে গুলি বের করার কথা জানিয়েছেন। বনের ভেতরে হাতির ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে তাঁরা মাচাং ঘর দেখেছেন, যেখান থেকে হাতিকে গুলি করা হয়।

অস্ত্রের উৎস ও আইনশৃঙ্খলা

২০২৫ সালের ১৫ মার্চ হাতি হত্যার ঘটনায় কক্সবাজারের ইনানীর গহিন বনের মাচাং ঘর থেকে একটি একনলা বন্দুক উদ্ধার করে বন বিভাগ। বন বিভাগ বলছে, এমএস পাইপ দিয়ে তৈরি এসব বন্দুকে শটগানের ছররা গুলি ব্যবহার করা হয়। কক্সবাজার জেলা পুলিশের চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অভিজিৎ দাশ প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সালে পুলিশ চকরিয়া থানার মাতামুহুরী এলাকা থেকে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। বিশেষ করে মহেশখালীর কালামারছড়া এলাকার গহিন পাহাড়ে অস্ত্র তৈরি হয়। সেখান থেকে কক্সবাজারের নানা জায়গায় এসব ছড়িয়ে পড়ে। নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

বিশিষ্ট বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান প্রথম আলোকে বলেন, হাতির ওপর গুলির ঘটনা থামাতে হলে পুলিশ, বন বিভাগ ও স্থানীয় রাজনীতিবিদ সবাইকে সম্মিলিত ভূমিকা রাখতে হবে। পুলিশের কাছে তথ্য থাকে কার কাছে বন্দুক আর গুলি আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্থানীয় রাজনীতিবিদ বন্য প্রাণী সংরক্ষণের পক্ষে না থাকলে পুলিশ কাজ করতে পারবে না। যেসব মাচাং থেকে হাতিকে গুলি করা হয়, সেগুলো ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।