চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে অনুষ্ঠিত তিনদিনব্যাপী আম মেলায় প্রায় ২০০ জাতের আম প্রদর্শিত হচ্ছে। মেলায় দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের দেশি জাতের ‘জালিয়াবান্ধা’ ও বিদেশি জাতের ‘ব্রুনাই কিং’ আমসহ বিভিন্ন জাতের আম দেখে দর্শনার্থীরা বিস্ময় ও মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন।
দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়া
শিবগঞ্জ উপজেলার গোয়ালপাড়ার বাসিন্দা স্বর্ণালী খাতুন (২৫) বলেন, ‘আম তো নয় যেন কুমড়ার জালি, এত বড় আকারে আম, আর এত জাতের আম আমি জীবনে দেখিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এলাকায় বিখ্যাত গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি ও আশ্বিনা জাতের আমকেই চিনি। আমাকে কেউ কখনো বলেনি এত এত জাতের আম আছে আমাদের এই জেলায়। এসে বুঝলাম কেন চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আমের রাজধানী বলা হয়।’
চরাঞ্চলের ইউনিয়ন সুন্দরপুরের বাসিন্দা (৪৫) বলেন, ‘আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ হয়েও জানতাম না আমার জেলায় এত এত জাতের আম আছে। আমি যেমন বিস্মিত হয়েছি, তেমনি মুগ্ধও হয়েছি। এত সব জাতের আম যেন হারিয়ে না যায়।’
আমের প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও উদ্যোক্তারা
মেলায় আমের প্রক্রিয়াজাত নানা পণ্য নিয়ে স্টল দিয়েছে ‘বরেন্দ্র কৃষি উদ্যোগ’ নামের একটি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান। এর স্বত্বাধিকারী মুঞ্জের আলম (৪৯) বলেন, ‘আমরা শুনে আসছি জেলায় ২৫০ জাতের বেশি আম ছিল। এখন আর ততটা আছে বলে জানা নেই। অনেক জাতই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক জাত বিপন্নপ্রায়। এখানে যে ১৮৩ জাতের আম প্রদর্শন করা হচ্ছে, তার মধ্যে প্রায় ৩০ জাতই হচ্ছে বিদেশি জাতের হাইব্রিড আম। জাতবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্যমান জাতগুলোর সংরক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।’
কিশোরগঞ্জ থেকে আগত দর্শনার্থীরা
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেলায় কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী থেকে আসা ছয় যুবকের সঙ্গে দেখা যায়। তাঁরা দারুণ আগ্রহ নিয়ে আমের জাতগুলো দেখছিলেন এবং আমের নাম লেখা কার্ডগুলো দেখে জাতের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাধন কুমার সরকারের কাছে।
কিশোরগঞ্জের ছয় যুবক হলেন মুসা মিয়া, মো. বিজয়, মো. সুমন মিয়া, মোহাম্মদ ইয়াসিন, মনির হোসাইন ও আরমান মিয়া। তাঁরা জানান, দেশের বৃহত্তম আমের বাজার কানসাট আমবাজার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বড় আমবাগানগুলো ঘুরে দেখার জন্য এসেছেন। অনলাইনে আম বিক্রেতা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছেলে শাহীনুরের কাছে আম মেলার কথা জানতে পেরে তাঁরা মেলায় এসেছেন।
মো. মুসা মিয়া বলেন, ‘জীবনে এই প্রথম এত জাতের আম একসঙ্গে দেখতে পেলাম। মেলায় আসাটা সার্থক হলো। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসে এটি বাড়তি পাওয়া।’
আমের জাতবৈচিত্র্য
কৃষি কর্মকর্তা সাধন কুমার সরকার জানান, আমের এত জাতবৈচিত্র্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া আর কোথাও নেই। বেশ কিছু জাত আছে, যেগুলো বিখ্যাত, জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক জাত। এর মধ্যে চারটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিআই পণ্য: ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা। এ ছাড়া গোপালভোগ, গৌড়মতী, রানিপসন্দ, কালীভোগ, মিছরিকান্ত, গোলাপবাস, দিল সাদ, দুধসর, কোহিতুর, বৃন্দাবনী, কুয়াপাহাড়ি, মধুচুসকি, জিলাপির ক্যাড়া, গরজিদ, বউভোলানী, জামাই খুশি, মোহন বাঁশি, কৃষ্ণভোগ, ইলামতী, কল্যাণভোগ, তোতাপুরি, ক্ষীর মোহন, মোহনভোগসহ আরও অনেক জাত রয়েছে। এ ছাড়া বেনামি অনেক জাতও আছে। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩০ জাতের বিদেশি আমের চাষ হচ্ছে।
মেলার আয়োজন ও উদ্বোধন
জেলা প্রশাসনের সহায়তায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় তিন দিনব্যাপী আম মেলার আয়োজন করেছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মঞ্চে মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইয়াছিন আলীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (আম গবেষণা কেন্দ্র) মুখ্য বৈজ্ঞানিক শরফ উদ্দীন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ, অধ্যক্ষ বিপ্লব কুমার মজুমদার, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া ও আমচাষি মুনজের আলম।
মেলার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য
আয়োজকেরা জানান, জেলার আমের বৈচিত্র্য তুলে ধরা, নতুন ও বিলুপ্তপ্রায় জাতের আমের সঙ্গে দর্শনার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং আমচাষিদের উদ্বুদ্ধ করতেই এ মেলার আয়োজন। মেলায় ১৬টি স্টলে আম ও আমের প্রক্রিয়াজাত পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে আম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে এ জেলার বাণিজ্যিক ও স্থানীয় পর্যায়ের ১৮৩ জাতের আম।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশ ও বিদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে ‘ক্যাপিটাল অব ম্যাংগো’ ব্যান্ডিং করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে আম নিবিড়ভাবে জড়িত। দেশের আম উৎপাদনে এ জেলার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আম উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে এ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।
মেলা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আগামীকাল শনিবার মেলার শেষ দিন।



