বিদ্যুৎ সংকটে বরিশালে বোরো সেচ ও ব্যবসা বিপর্যস্ত, কৃষকেরা দুশ্চিন্তায়
বিদ্যুৎ সংকটে বরিশালে বোরো সেচ ও ব্যবসা বিপর্যস্ত

বিদ্যুৎ সংকটে বরিশালে বোরো সেচ ও ব্যবসা বিপর্যস্ত, কৃষকেরা দুশ্চিন্তায়

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের মধ্যে বরিশালে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মানুষ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। ভ্যাপসা গরমে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন তাঁরা। একই সঙ্গে লোডশেডিং ও ডিজেল–সংকটে চলতি বোরো মৌসুমে ঠিকমতো সেচ দিতে না পারায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যেও দেখা দিয়েছে মন্দা।

বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ঘাটতি

বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা (ওজোপাডিকো)। এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় ছয়টি জেলা শহরে গ্রাহক আছেন প্রায় পাঁচ লাখ। এর মধ্যে বরিশাল নগরে গ্রাহকসংখ্যা দেড় লাখের বেশি। অন্যদিকে উপজেলা সদর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। বিভাগের পাঁচটি পবিসের আওতায় গ্রাহক আছেন প্রায় ২১ লাখ ৬৫ হাজার।

বরিশাল জাতীয় গ্রিড উপকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পিরোজপুর জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৫৫০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাওয়ার গ্রিড উপকেন্দ্র বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান পলাশ বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা পিক ও অফপিক আওয়ারে ওঠানামা করে। তবে বর্তমানে আমাদের চাহিদার ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য সেটা লোডশেডিং করে সমন্বয় করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিতরণ কর্তৃপক্ষ শিল্পাঞ্চলসহ অধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসমূহে কম লোডশেডিং দিয়ে বিদ্যুৎ সমন্বয় করে। এ জন্য গ্রাহক পর্যায়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমবেশি মনে হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বোরো সেচে মারাত্মক সংকট

‘ডিজেল আনতে গিয়ে পাচ্ছি না আবার বৈদ্যুতিক মোটর দিয়ে সেচ দেব, সে জন্য বিদ্যুৎও পাচ্ছি না। তাই এবার বোরো চাষে লাভের মুখ তো দূরে থাকুক, মোটা লোকসান গুনতে হবে। জানি না কীভাবে বাঁচব আমরা।’ বরিশালের গৌরনদীর বার্থী এলাকার বোরো চাষি মাসুদ সরদার এমন আশঙ্কার কথা বলেন।

রোববার দুপুরে মাসুদ সরদার বলেন, এখন ধানের থোড় বের হওয়ার সময়। এ সময় ব্যাপক সেচ দরকার। কিন্তু প্রয়োজনীয় সেচ দিতে না পারায় ফলন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, তাঁর ব্লকে প্রায় ৭০ জন কৃষকের ৩৬ একর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। তিনি সেচ ব্যবস্থাপনা কমিটির ব্যবস্থাপকও। এই কৃষক আরও বলেন, বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই ডিজেল–সংকট চলছে। পাম্পমালিকেরা নানা অজুহাতে ডিজেল দিচ্ছেন না। এখন কৃষক কার্ড চাওয়া হচ্ছে। দিলেও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এত দিন বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করা হলেও ১০-১২ দিন ধরে বিদ্যুতের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, তাঁদের দুই ধাপে সেচ দিতে হয়—প্রথমে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ওয়াপদা খালে, এরপর সেখান থেকে জমিতে পানি নিতে হয়। এতে খরচ এমনিতেই বেশি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেচ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, ধানের থোড় বের হতে পারছে না।

বরিশালের কাশীপুর এলাকায় প্রায় ১০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন কৃষক গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেন, আগাম চাষ করা জমির ধান পাকতে শুরু করেছে, কিন্তু দেরিতে চাষ করা জমিতে সেচের অভাবে ধান ঠিকমতো বের হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘যেসব ধান পেকে এসেছে তা হার্ভেস্টার মেশিন দিয়ে কাটাব; কিন্তু মেশিন চালানোর জন্য তেল পাচ্ছি না। আবার সেচ দিতেও পারছি না। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা আশ্বস্ত করেছেন ডিজেলের ব্যবস্থা করে দেবেন।’

মাঠপর্যায়ের একজন কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ধানের থোড় থেকে শিষ বের হওয়ার সময় বোরো খেতে সবচেয়ে বেশি সেচ প্রয়োজন হয়। এ সময় জমিতে চার থেকে ছয় ইঞ্চি পানি থাকা জরুরি। না হলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

ব্যবসায়ও মন্দা দেখা দিয়েছে

বিদ্যুৎ–সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশনা থাকায় এমনিতেই ব্যবসা কমে গেছে। তার ওপর দিনে একাধিকবার লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

গির্জা মহল্লা এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সকাল ১০টায় দোকান খোলার পর থেকে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। প্রতিবার কখনো আধা ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় বন্ধ থাকে। আবার সন্ধ্যা সাতটায় বন্ধ করতে হয়। এভাবে চললে ব্যবসা কী করে টিকিয়ে রাখব আমরা?’

নগরের সদর রোডের শীর্ষস্থানীয় দরজি ও ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান ‘টপ টেন ফেব্রিকস অ্যান্ড টেইলর লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপক ইমরান শেখ বলেন, ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকটে আমাদের নাস্তানাবুদ অবস্থা। সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে শোরুম বন্ধ করতে হয়। দিনে তীব্র গরমে বিদ্যুতের লোডশেডিং। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি ব্যবসায়ও খুব মন্দা দেখা দিয়েছে।’