কক্সবাজারের লবণচাষিরা: সংকটের দ্বিগুণ বোঝা
কক্সবাজারের লবণচাষিরা আজ একাধিক সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়েছেন। একদিকে উৎপাদন খরচের তুলনায় অত্যন্ত নিম্ন দাম, অন্যদিকে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ—এই দুইয়ের চাপে প্রান্তিক চাষিরা দিশাহারা হয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধারাবাহিক লোকসান এবং বৃষ্টির আশঙ্কায় মৌসুম শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস আগেই জেলার অধিকাংশ লবণমাঠে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন চাষিরা। দেশি লবণশিল্পের স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং এই খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার স্বার্থে বিষয়টি নিয়ে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রকৃতি ও বাজার: চাষিদের জন্য দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জ
চলতি মৌসুমে জেলার প্রায় ৬৮ হাজার ৫০০ একর জমিতে ৪২ হাজার প্রান্তিক চাষি লবণ চাষে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ আচরণ শুরু থেকেই তাঁদের ভোগাচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ঘন কুয়াশার কারণে চাষে নামতে বিলম্ব হয়েছে। এরপর ৭ ও ৮ এপ্রিলের হঠাৎ বৃষ্টিতে মাঠের বিপুল উৎপাদিত লবণ গলে নষ্ট হয়ে গেছে। খোলা মাঠের কাছাকাছি পর্যাপ্ত লবণ সংরক্ষণাগার না থাকায় প্রতিবছরই বৈরী আবহাওয়ায় এমন বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। তবে প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার চেয়েও চাষিদের বেশি পোড়াচ্ছে লবণের অন্যায্য দাম। এক মণ লবণ উৎপাদনে খরচ পড়ে ২৯০ টাকা, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ২৪০-২৫০ টাকায়। ফলে ঋণ ও দাদনের টাকায় নামা চাষিরা মূলধন দূরের কথা, সংসারের সাধারণ ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
উৎপাদন ঘাটতি ও আমদানির আশঙ্কা
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্যমতে, গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় এবার লবণ উৎপাদন প্রায় সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন পিছিয়ে আছে। বৈরী পরিবেশের কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কারণ হলো, এই সাময়িক ঘাটতির অজুহাত তুলে একটি অসাধু সিন্ডিকেট লবণ আমদানির পাঁয়তারা করতে পারে। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করা হলে দেশি লবণশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সমাধানের পথ: সরকারি হস্তক্ষেপ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
দেশি শিল্প সুরক্ষায় প্রান্তিক চাষিদের টিকিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই। সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। প্রথমত, চাষিরা যাতে তাঁদের ঘাম ঝরানো লবণের অন্তত প্রতি মণ ৪০০ টাকা ন্যায্যমূল্য পান, বাজার তদারকির মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হঠাৎ ঝড়বৃষ্টির ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা না থাকায় কম দামে লবণ বিক্রির বাধ্যবাধকতা কাটাতে মাঠপর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক লবণ সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা জরুরি। পাশাপাশি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোভাবেই দেশে লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়া যাবে না। সংরক্ষণাগার নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পেলে এই চাষিরাই দেশের লবণের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবেন।



