ঠাকুরগাঁওয়ে আবুল কালামের আঙুরবাগান: শখ থেকে সম্ভাবনার গল্প
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ঝলঝলি বসন্তপুর গ্রামের উদ্যোক্তা আবুল কালাম আজাদের বাড়ির পথ এখন যেন এক জীবন্ত আঙুরবাগান। পথের দুই পাশে সারি সারি ফলের গাছ, আর মাথার ওপর বাঁশের মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে সবুজ আঙুর। দূর থেকেই চোখে পড়া এই দৃশ্য দেখতে পথচারীরা থমকে দাঁড়ান, অনেকে ছবি তুলে নিয়ে যান।
শখের শুরু, সম্ভাবনার বিস্তার
আবুল কালাম আজাদ একসময় সৌদি আরবে ছিলেন। কাজের ফাঁকে সেখানকার ফলের বাগান ঘুরে দেখতেন, যা তাঁকে দেশে এমন একটি বাগান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখায়। দেশে ফিরে প্রথমে সবজি চাষ শুরু করলেও পরে মন দেন আঙুর চাষে। শুরুতে ৭০টি গাছ দিয়ে বাগান গড়ে তোলেন তিনি। বর্তমানে তাঁর বাগানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১ হাজার ২০০টি আঙুরগাছ আছে, যেগুলোয় এবার দ্বিতীয়বারের মতো ফল এসেছে।
প্রতিটি গাছ থেকে ৫ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত আঙুর পাওয়ার আশা করছেন তিনি। গাছের থোকায় থোকায় আঙুরে ভরে উঠেছে পুরো বাগান। সরেজমিনে দেখা যায়, পাকা সড়কের পাশে সারি সারি দোকানঘরের মাঝ দিয়ে বাড়ির প্রবেশপথ। পুরো পথজুড়ে উঁচু মাচা তৈরি করে নাইলনের সুতা টানানো হয়েছে, যার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে আঙুরলতা। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে লম্বাটে ও গোলাকার নানা জাতের আঙুর।
বহুমুখী বাগানের বৈচিত্র্য
আবুল কালামের বাগান শুধু আঙুরেই সীমাবদ্ধ নয়। বাগানের পথের দুই পাশ ও পুকুর পাড়জুড়ে আছে আরও নানা বিদেশি ফলের গাছ। বেদানা, লটকন, জামরুল, ড্রাগন ফল, প্যাশন, মাল্টা, আপেল, নাশপাতিসহ ৩০ প্রজাতির ফলের গাছ রয়েছে এখানে। পাশাপাশি চুইঝাল, গোলমরিচসহ নানা মসলা–জাতীয় গাছও শোভা পাচ্ছে। তিনি জৈব পদ্ধতিতে এই আঙুর ও ফলের চাষ করছেন, যা পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচিত।
চাষাবাদের পদ্ধতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
আবুল কালাম জানান, তিনি ইউটিউব দেখে দেখে আঙুর চাষ শিখেছেন। লতানো গাছ হওয়ায় উঁচু মাচা তৈরি করা জরুরি। মূলত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়, অন্য কোনো রাসায়নিকের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। ফেব্রুয়ারিতে ডালপালা ছাঁটাই করলে মার্চে ফুল আসে আর জুন-জুলাইয়ের দিকে ফল সংগ্রহ করা যায়।
গাছ রোপণ ও পরিচর্যায় তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। তবে চলতি মৌসুমেই ৯০ থেকে ১০০ মণ আঙুর উৎপাদনের আশা করছেন তিনি, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা হতে পারে। এ বছরই খরচ উঠে আসবে বলে আশা করছেন তিনি। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে চারা নিয়ে চাষ শুরু করেছেন, যা স্থানীয় কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
স্থানীয় প্রশংসা ও কৃষি বিভাগের সমর্থন
আঙুরবাগানের প্রথম ফল তিনি এলাকাবাসীর মধ্যে বিলিয়ে দেন। মিষ্টি স্বাদের সেই আঙুর খেয়ে গ্রামবাসীর প্রশংসায় ভেসে যান আবুল কালাম। এ বছর ফলন আরও বেশি হওয়ায় বাগানটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ বাগান দেখতে আসছেন।
সম্প্রতি পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান আঙুরবাগান পরিদর্শনে যান। তিনি বলেন, আঙুর চাষে দোআঁশ মাটি, জৈব সারসমৃদ্ধ কাঁকর মাটি সবচেয়ে উপযোগী। আবুল কালাম দুই বছর ধরে আঙুর চাষ করছেন এবং ভালো ফল পাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আবুল কালামের বাগানে যে আঙুরের ফলন দেখা যাচ্ছে, তা আশাব্যঞ্জক এবং কৃষি বিভাগ তাঁর পাশে থাকবে।
আগামী দেড় মাসের মধ্যেই আঙুরগুলো পরিপক্ব হবে বলে জানান আবুল কালাম। স্বাদে মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারেও ভালো চাহিদা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন, যা বাণিজ্যিক সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।



