হাওরের জিরাতি কৃষকদের বৈশাখী আনন্দমেলা: খেলাধুলায় মেতেছে কৃষক পরিবার
কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বাকুলিয়া হাওরে জিরাতি কৃষকরা বৈশাখী আনন্দমেলায় অংশ নিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেছেন। মঙ্গলবার দিনব্যাপী আয়োজিত এই মেলায় বস্তাদৌড়, দড়িটান, বেলুন ফুটানো, হাঁড়িভাঙা, হাঁস ধরাসহ নানা খেলায় মেতে উঠেছেন নানা বয়সী কৃষকেরা।
জিরাতি কৃষকদের জীবনযাত্রা ও উৎসবের প্রেক্ষাপট
বোরো ধানের মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার বিভিন্ন হাওরের মাঠে অস্থায়ী জিরাতি বাড়ি দেখা যায়। খড়কুটো দিয়ে তৈরি এসব ঘরে গরু-ছাগলসহ গাদাগাদি করে কষ্টে বসবাস করেন কৃষকেরা। বছরের অর্ধেক সময় তারা এখানে কাটান, স্বপ্নের সোনালি ফসল ধান গোলায় তোলার উদ্দেশ্যে। সপ্তাহখানেক পর থেকেই পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে, এবং মাসখানেক পর জিরাতি বাড়িসহ কষ্টার্জিত ধান নিয়ে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাবেন তারা।
আনন্দমেলার আয়োজন ও অংশগ্রহণ
এসব কৃষকের ক্লান্তি কাটাতে এবং আনন্দ দিতে তাড়াইলের দামিহা ইউনিয়নের কাজলা গ্রামের বাসিন্দা সমাজসেবক ও আইনজীবী মাহফুজুল হক তিন শতাধিক কৃষককে নিয়ে ব্যতিক্রমী কৃষক আনন্দমেলার আয়োজন করেন। জেলার ইটনার বাকুলিয়া হাওরে দামিহা এলাকাসহ আশপাশের কৃষকেরা সবাই হলুদ রঙের গেঞ্জি পরে দিনব্যাপী এ বৈশাখী আনন্দে যোগ দেন। প্রথমে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করা হয়, যাতে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগব্যাধি থেকে তাদের ফসল রক্ষা পায়। এরপর সবাই মিলে দুপুরে খাবার খেয়ে বিকেলে উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন খেলায় মেতে ওঠেন। শেষে ২৫ বিজয়ীর মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
কৃষকদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দামিহা কাজলা গ্রামের কৃষক লাল মিয়া জানান, পরিবার-পরিজন রেখে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে তারা হাওরের মাঝখানে জিরাতি বাড়িতে বসবাস করছেন, আরও এক মাস থাকতে হবে। সোনালি ফসলের আশায় এই সময় তারা হাড়ভাঙা খাটুনি কাটিয়েছেন। দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন জায়গায় সময় কাটলেও সমাজসেবী মাহফুজুল হকের উদ্যোগে আনন্দমেলা তাদের খুব ভালো লেগেছে। হাওরে এর আগে কৃষকদের নিয়ে এ রকম আনন্দমেলা খুব কমই হয়েছে।
আয়োজক আইনজীবী মাহফুজুল হক বলেন, ‘মাঠের তপ্ত রোদে পুড়ে যে মানুষগুলো সবার মুখে অন্ন তুলে দেন এবং যাদের ঘামেই লুকিয়ে থাকে দেশের সমৃদ্ধি, সেই কৃষকদের নিয়ে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করতে পারাটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। তাদের মুখে একটু আনন্দ আর ক্লান্তি দূর করতেই এই কৃষক আনন্দমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। আমরা সামনের দিনগুলোতেও কৃষকদের নিয়ে এসব আনন্দ উৎসব আয়োজনের চেষ্টা করব।’
কৃষকেরা ছাড়াও বৈশাখী এ আনন্দমেলায় দামিহা ইউনিয়নের গণমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন, যা স্থানীয় সম্প্রীতি ও উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।



