নেত্রকোনার হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু, প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে জ্বালানি তেল সহজলভ্য
নেত্রকোনার হাওরে ধান কাটা শুরু, প্রশাসনের উদ্যোগ

নেত্রকোনার হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু, প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে জ্বালানি তেল সহজলভ্য

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা পুরোদমে শুরু হয়েছে। গত রোববার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙাপোতার মাঘান-সিয়াধার ইউনিয়নের শেওরাতলি এলাকায় প্রথম ধান কাটার কাজ শুরু হয়। যদিও এক সপ্তাহ আগে থেকেই কিছু এলাকায় আগাম কাটা চলছিল, তবে রোববার থেকে এটি ব্যাপক আকার ধারণ করে। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫ শতাংশ খেতের ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের মতে, পরিবেশ অনুকূলে থাকলে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ ধান কাটা হয়ে যাবে।

হারভেস্টারের জ্বালানি তেল সহজলভ্য করতে প্রশাসনের উদ্যোগ

ধান কাটার হারভেস্টারের জ্বালানি তেল সহজলভ্য করতে জেলা প্রশাসন বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। হাওর এলাকার বাজারগুলোতে প্রশাসনের মনিটরিংয়ের মাধ্যমে খুচরাভাবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কৃষকদের তেল কেনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় সব কটি হাওরসহ নিম্নাঞ্চলে এবার ৪১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধান। এসব ধানের জীবনকাল ১৪৫ দিন। শ্রমিকের পাশাপাশি সাত শতাধিক কম্বাইন্ড হারভেস্টরে ধান কাটা চলছে, এবং জ্বালানি তেলের সংকট যাতে না হয়, সে জন্য প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফসলের ক্ষতি ও বৃষ্টির দুশ্চিন্তা

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়, এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টন ধান। তবে চৈত্রের মাঝামাঝি সময় থেকে বৃষ্টি হওয়ায় হাওরের নিচু ধানখেতে পানি জমেছে। সরকারি হিসাবে ১ হাজার ১২০ হেক্টর জমির কাঁচা ধান নিমজ্জিত হয়ে নষ্ট হয়েছে, যদিও কৃষকেরা বলছেন ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। যেসব খেতে পানি জমেছে, সেখানে কম্বাইন্ড মেশিনে ধান কাটা যাবে না, ফলে শ্রমিক দিয়ে কাটতে হবে যা খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কলমাকান্দার বড়খাপন এলাকার কৃষক পলাশ তালুকদার উদাহরণ দেন যে, তিনি মেদারবিল হাওরে চার একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন, যার এক একর নিচু জমিতে পানি জমেছে এবং সেখানে মেশিন ব্যবহার সম্ভব নয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন্যার পূর্বাভাস নেই, কৃষকদের আশ্বাস

প্রায় প্রতিদিন রাতে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হওয়ায় ধান কাটা নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, কারণ ভারী বৃষ্টিতে আগাম বন্যা হলে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরের ধান তলিয়ে যেতে পারে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস নেই। এ সময় সুনামগঞ্জে ও উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জীতে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে, যা বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে না। কৃষকরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কেটে ঘরে তুলতে পারেন, সে জন্য পাউবো কর্মীরা ছুটি বাতিল করে সর্বক্ষণ মাঠে রয়েছেন।

সরকারি ধান ক্রয় অভিযান শুরুর দাবি

এদিকে, সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু না হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা স্থানীয় হাটবাজারে ও মহাজনদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করছেন। খালিয়াজুরীর পুরানহাটি গ্রামের কৃষক শামসুর রহমান বলেন, এবার পানি না আসায় এবং কোনো দুর্যোগ না হওয়ায় তারা নিরাপদে ধান কাটতে পারছেন, কিন্তু সরকার ধান কেনা শুরু না করায় স্থানীয় মহাজনদের কাছে প্রতি মণ ধান ৯২০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। নগর গ্রামের কৃষক দুলু সরকার আরও উল্লেখ করেন যে, হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে, কিন্তু কৃষকদের হাতে ধান থাকলেও কয়েক দিন পরেই তা মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের হাতে চলে যেতে পারে, কারণ প্রান্তিক কৃষকরা মহাজনসহ বিভিন্নভাবে ঋণ নিয়ে ফসল ফলান এবং ঋণ পরিশোধের জন্য মৌসুমের শুরুতেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। তাই তারা সরকারিভাবে দ্রুত ধান কেনার দাবি জানাচ্ছেন। জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক মোয়েতাছেমুর রহমান জানান, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, হাওরাঞ্চলে এখন পুরোদমে ধান কাটা চলছে এবং কৃষকরা যাতে বোরো ফসল নির্বিঘ্নে গোলায় তুলতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।