কক্সবাজারের চরাঞ্চলে তামাকের বদলে বাদাম চাষ: কৃষকের সাফল্যের গল্প
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় মাতামুহুরী নদীর চরে একসময় তামাক চাষের দাপট ছিল। তবে এখন দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তামাকের পরিবর্তে খেতজুড়ে শীতকালীন সবজি ও মৌসুমি ফসলের পাশাপাশি বাদাম চাষের প্রসার ঘটছে। ভালো ফলন ও অধিক লাভের কারণে স্থানীয় চাষিরা এ দিকে ঝুঁকছেন।
বাদাম চাষের বিস্তৃতি ও পরিসংখ্যান
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চকরিয়ায় বাদাম চাষের এলাকা ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি মৌসুমে ৪৬২ একর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে, যা আগের দুই অর্থবছরের ৪৫০ ও ৪২৫ একরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩৫০ একর জমি মাতামুহুরী নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত। হাজিয়ানার চর, বাটাখালী, আমাইন্ন্যার চর, ঘাইট্টার চর, মাঝের ফাঁড়ি, প্রপার কাকারা, মিনিবাজার এবং সুরাজপুর চরের মতো বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন বাদামের চাষ দৃশ্যমান।
চাষিদের অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক লাভ
সুরাজপুর চরে সরেজমিনে দেখা গেছে, চাষিরা বাদাম তোলা, বাছাই করা এবং বাজারজাত করার কাজে ব্যস্ত। আলী আহমদ নামের এক চাষি সাড়ে ছয় একর জমিতে বাদাম চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি একরে চাষের খরচ প্রায় ৬৫ হাজার টাকা, আর বিক্রি করে পাওয়া যায় প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। ফলে প্রতি একরে তাঁর লাভ দাঁড়ায় সাড়ে ৭২ হাজার টাকা, এবং এ মৌসুমে মোট লাভ হবে প্রায় ৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
অন্য এক তরুণ চাষি খোরশেদ আলম পড়াশোনা শেষে চাকরি না পেয়ে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। তিনি ২৫ শতক জমিতে ১৬ হাজার টাকা খরচ করে বাদাম চাষ করে ২৬ হাজার ৪০০ টাকা আয় করেছেন। আগামী মৌসুমে চাষের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে।
বাজার দর ও বিক্রয় প্রক্রিয়া
চাষিদের মতে, মাঠপর্যায়ে বাদাম প্রতি কেজি প্রায় ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়। পাইকারেরা একর বা কেজি—উভয়ভাবেই কিনে থাকেন। প্রতি একরের বাদাম ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। বাজারে খুচরা দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি, আর বীজ হিসেবে ব্যবহৃত বাদাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়।
বাদামের পাইকার মোহাম্মদ রফিক বলেন, "ভরা মৌসুমে দাম কিছুটা কমলেও বাদামে সাধারণত লোকসান হয় না। ২০ থেকে ২৫ দিন আগে প্রতি একরে দাম ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, এখন তা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় নেমেছে।"
তামাক চাষের প্রভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
তামাক চাষের প্রভাব নিয়ে চাষিরা এখনো উদ্বিগ্ন। তাঁদের অভিযোগ, তামাকখেতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারের প্রভাবে আশপাশের জমির ফলন কমে যাচ্ছে। আগে একটি গাছে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত ফলন হতো, যা এখন প্রায় ১০০ গ্রামে নেমে এসেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও তামাক থেকে বাদামে ঝুঁকে পড়ার একটি বড় কারণ। সুরাজপুর চরের বাসিন্দা কানিজ ফাতেমা বলেন, "তামাক চাষ করতে গিয়ে আমাদের পরিবারের সদস্যদের শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগ দেখা দিয়েছিল। পরে আমরা তামাক ছেড়ে বাদাম চাষ শুরু করি। এখন আয় ভালো, আর স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমেছে।"
জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও কৃষি বিভাগের ভূমিকা
জাহাঙ্গীর আলম নামের আরেক চাষি আগে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে আট বছর ধরে বাদাম চাষে যুক্ত হয়ে তিনি এখন সচ্ছল। এ মৌসুমে পাঁচ একর জমিতে চাষ করে তিনি ইতিমধ্যে চার লাখ টাকার বাদাম বিক্রি করেছেন, এবং আরও কয়েক লাখ টাকার ফসল মাঠে রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী বলেন, "বর্ষায় মাতামুহুরী নদীর উজান থেকে নেমে আসা পলিতে চরাঞ্চলের মাটি উর্বর হয়ে ওঠে, ফলে সেখানে ভালো ফলন হয়। একসময় মাত্র ৩০ একর জমিতে বাদাম চাষ হলেও এখন তা বেড়ে ৩৫০ একরে পৌঁছেছে। লাভজনক হওয়ায় তামাকচাষিরাও ধীরে ধীরে বাদাম চাষে ঝুঁকছেন। কৃষি বিভাগও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাষিদের উৎসাহিত করছে।"
বাদাম চাষের মৌসুম সম্পর্কে চাষি খানে আলম জানান, আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত বীজ বপন করা হয়, আর ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ থেকে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফসল তোলা চলে। প্রায় ১০০ দিনের মধ্যেই বাদামের ফলন পাওয়া যায়, যা চাষিদের জন্য একটি দ্রুত ও লাভজনক বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।



