বাগেরহাটে লবণপানি ঢোকানো বন্ধের দাবিতে কৃষকদের মানববন্ধন
বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নে জলকপাট ও অবৈধ পাইপের মাধ্যমে লবণপানি ঢোকানোয় শত শত একর জমির ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নদী-খাল ও ফসলের মাঠে লবণপানি প্রবেশ বন্ধের দাবিতে শনিবার বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডেমা ইউনিয়নের ভুক্তভোগী কৃষকগণ ব্যানারে আয়োজিত এই মানববন্ধন শেষে কৃষকরা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন।
ধান নষ্টের শঙ্কা ও অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে কৃষকরা অভিযোগ করেন যে, লবণপানির কারণে ডেমা ইউনিয়নের অন্তত আট হাজার একর জমির ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে ডেমা ইউনিয়নের হেদায়েতপুর গ্রামের কৃষক এস এম আরাফাত হোসেন বলেন, “আমাদের এখানে ৫২ শতকে বিঘা জমি আছে। এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। যাঁরা নগদ টাকায় জমি রেখে চাষ করেন, তাঁদের ব্যয় আরও বেশি। মাঠে প্রায় গাছে ধানের শিষ চলে এসেছে, এ মাসের মধ্যেই বেশির ভাগ ধান পেকে যাবে। এখন যদি লবণপানি ঢোকানো হয়, তাহলে আমাদের মতো কৃষকদের বাঁচার পথ থাকবে না।”
অবৈধ পাইপ ও জলকপাটের ব্যবহার
মানববন্ধনে কৃষকরা আরও অভিযোগ করেন যে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মানুষের কারণে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ডেমা ইউনিয়নে ১৭টি জলকপাট ও ১৬টি অবৈধ পাইপ দেওয়া আছে। মাঠের ধান এখন ফলনের অপেক্ষায় থাকলেও, মাছ চাষের জন্য অবৈধভাবে জলকপাট দিয়ে লবণপানি তোলা হচ্ছে। এতে সব ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এলাকার কোনো সাধারণ মানুষ বা কৃষকই লবণপানি ঢোকানোর পক্ষে নয়, কিন্তু নদী-খালগুলো অবৈধভাবে দখল করে মাছ চাষকারীরা লবণপানি ঢোকাচ্ছেন। বারবার প্রশাসনের কাছে দরখাস্ত করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তাঁরা মানববন্ধনে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন।
কৃষকদের দাবি ও প্রতিক্রিয়া
কৃষকদের ধান রক্ষায় অতি দ্রুত লবণপানি প্রবেশ বন্ধ করার দাবি জানিয়ে তাঁরা বলেন, “এরপরও যদি প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ইউনিয়নবাসী ডিসি ও ইউএনও কার্যালয়ে অবস্থান নিতে বাধ্য হবেন।” মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বিল্লাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, “আমার বাড়ি বাগেরহাটে। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিছু প্রভাবশালী মানুষ চিংড়ি চাষের জন্য লবণপানি প্রবেশ করাচ্ছেন। এতে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে ইউনিয়নের অন্তত আট হাজার একর জমির ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের বাঁচাতে লবণপানির প্রবেশ ঠেকাতে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
প্রশাসনের পদক্ষেপ
জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন মুঠোফোনে বলেন, “দখল হয়ে যাওয়া নদী-খাল উদ্ধারে কাজ শুরু হয়েছে। স্লুইসগেট দিয়ে লবণপানি ঢোকানো রোধে ইতিমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। এখানে দুটি পক্ষ হয়ে গেছে। কেউ মাছচাষি, কেউ ধানচাষি। একপক্ষ লবণপানি ঢোকাতে চায়। ধানচাষিদের এতে ক্ষতি হয়। গত দেড় মাস ধরে তাঁরা এটা নিয়ে কাজ করছেন। আশা করছেন, দ্রুত সমাধান হবে।”
কৃষি বিভাগের তথ্য
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭১ একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন কৃষকেরা। এই বিশাল এলাকায় ধান চাষের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে লবণপানি ঢোকানো বন্ধের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।



