সুনামগঞ্জের হাওরে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন, ফসলহীন বছর সামনে
সুনামগঞ্জ হাওরে জলাবদ্ধতায় ধান ক্ষতি, কৃষকের হাহাকার

সুনামগঞ্জের হাওরে জলাবদ্ধতায় কৃষকের স্বপ্ন ভেসে যাচ্ছে পানিতে

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের উত্তর পাড়ের ইছাগড়ি গ্রামের কৃষক মুজিবুর রহমান (৫৫) তাঁর জলাবদ্ধ জমি থেকে তোলা কাঁচা ধানগাছ দেখিয়ে আক্ষেপ করছেন। এবার তিন একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি, যা পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ সব খরচ মেটাত। কিন্তু শ্রমে-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার পাকার আগেই তলিয়ে গেছে পানিতে। সামনে একটা বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় দিশাহারা মুজিবুর রহমান।

হাজারো কৃষকের একই দশা

গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় মুজিবুর রহমানের মতো ফসলের ক্ষতিতে সুনামগঞ্জের হাজারো কৃষকের এখন একই অবস্থা। ফসল হারিয়ে তারা অসহায়। একদিকে ফসল ডুবছে, অন্যদিকে কোনো কোনো হাওরে ফসল রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। পানিনিষ্কাশনের জন্য অনেক হাওরে বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও পাম্প বসিয়ে ব্যবস্থা করা হচ্ছে পানি সরানোর। যে বাঁধ ফসল রক্ষা করবে, কোথাও কোথাও সেই বাঁধই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য।

ক্ষতির হিসাবে বিভ্রান্তি

জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও জেলা কৃষি বিভাগের কাছে সেই ক্ষতির কোনো সঠিক হিসাব নেই। তারা বলছে, জেলার ৬টি উপজেলায় ১ হাজার ৮১৯ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার তথ্য আছে তাদের কাছে। এই তথ্যকে হাস্যকর বলছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শুধু সদর উপজেলার দেখার হাওরেই দুই হাজার হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। পুরো জেলায় তা ১৫ হাজার হেক্টরের বেশি হবে বলে স্থানীয়রা অনুমান করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মেদ বলেছেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষতির হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন লাগবে। ধানগাছ যদি ৫ থেকে ৬ দিন নিমজ্জিত থাকে, তাহলে ক্ষতি হবে; এর আগে যদি পানি নেমে যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে।

কৃষকের ব্যক্তিগত বেদনা

কৃষক মুজিবুর রহমানকে এবার দেখার হাওর থেকে শূন্য হাতে ফিরতে হবে। হাওরে তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান দেখিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ধানটা পাকলে কাটার চেষ্টা করতাম। মনরে বোঝ দিতাম। কাঁচা ধান ডুবরায় চোখের সামনে গেল। বছরটা কি-লা যাইব, এই চিন্তায় রাইতে ঘুম অয় না।’ একই গ্রামের আরেক কৃষক আতাউর রহমান (৫০) জানান, হাওরে তাঁর সাত একর জমির মধ্যে পাঁচ একরই তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে, পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাবে। এখন এসব জমিতে পানি থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।

বৃদ্ধ রবীন্দ্র দাস (৬০) বলছিলেন, জমি আবাদ করতে গিয়ে ধারদেনা করতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ কীভাবে দেবেন আর বাকি বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় পেয়ে বসেছে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘কিলা কিতা করমু। বুকটা ভাঙি যার। কিলা চলমু। সরকারে ত কুনতা করল না, সব ধান গেলগি।’ কথা বলার সময় তাঁর চোখ টলমল করছিল।

স্থানীয় উদ্যোগ ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা

দেখার হাওরে চারটি উপজেলার ২০ হাজার হেক্টরের ওপরে জমি আছে, যার মধ্যে সদর উপজেলার বেশি। হাওরের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতায় জমিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ইউপির সাবেক সদস্য রেদোয়ান আলী জানান, এই এক হাওরের অন্তত দুই হাজার হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। হাওরের উতারিয়া বাঁধ, শান্তিগঞ্জ অংশে মহাসিং নদীতে বাঁধের কারণে নিচু অংশে পানি জমে আছে, কিন্তু এই পানিনিষ্কাশনের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রশাসনের কর্মকর্তারা শুধু এসে দেখে গেছেন।

দেখার হাওরের মতো সদর উপজেলার জোয়ালভাঙ্গা হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাখিমারা হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলা হালির হাওরসহ বেশ কয়েকটি হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি হাওর পানিনিষ্কাশনের জন্য কৃষক ও স্থানীয় লোকজন বাঁধ কেটে দিয়েছেন। প্রশাসন থেকে নিষেধ করলেও মানুষ ফসল রক্ষায় বাঁধ কেটেছেন। জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরের ইনচানপুর ও ঝুনুপুর এলাকায় স্থানীয় কৃষকেরা কয়েকটি পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

আন্দোলন ও প্রতিবাদ

সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ জানান, তাঁদের সংগঠনের সদস্যরা প্রতিটি হাওরে যাচ্ছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলাবদ্ধতায় অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের কারণেই অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা আহাজারি করছেন, কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো উদ্যোগ নেই।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় এবার ১৪৫ কোটি ব্যয় ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ হচ্ছে। এই কাজের নির্ধারিত সময় ছিল ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের এক মাসও পরও কাজ শেষ হয়নি। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেছেন, বাঁধের কাজ শেষ এবং কাজে কোনো অবহেলা বা অনিয়ম ছিল না; অতিবৃষ্টির কারণেই মূলত হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

হাওরে বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি ও জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতির প্রতিবাদে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলায় গণসমাবেশ করেছে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন। সংগঠনের নেতারা প্রতিটি উপজেলায় এই প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন, যা কৃষকদের বেদনা ও ক্ষোভের প্রতিফলন।