বগুড়ায় আলু চাষে লোকসান: প্রতি কেজিতে ৫-৬ টাকা ক্ষতি, হতাশ কৃষকরা
বগুড়ায় আলু চাষে লোকসান: প্রতি কেজিতে ৫-৬ টাকা ক্ষতি

বগুড়ায় আলু চাষে লোকসান: প্রতি কেজিতে ৫-৬ টাকা ক্ষতি, হতাশ কৃষকরা

বগুড়া জেলায় এবার আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না মিলায় কৃষকরা চরম হতাশার মুখে পড়েছেন। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে আলু বিক্রি করতে গিয়ে তারা প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা লোকসান গুনছেন। এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক আগামীতে কম জমিতে আলু চাষের কথা ভাবছেন, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

লক্ষ্যমাত্রা ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান

বগুড়া কৃষি বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৫৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে। গত ২০২৫ সালে জেলায় ৫৫ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৯১০ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, কিন্তু আবাদ হয়েছিল ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার ৩৭৫ হেক্টর বেশি ছিল। ওই বছর মোট উৎপাদন হয়েছিল ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭০ মেট্রিক টন, যা অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আবাদি জমি ও ফলন উভয়ই বৃদ্ধির ফলাফল।

উৎপাদন খরচ ও বাজার দরের বিশ্লেষণ

কৃষক ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে এখন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। এই খরচের মধ্যে শুধু বীজেই লাগে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সার ও কীটনাশকের জন্য যায় আরও ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। রোপণ থেকে নিড়ানি ও উত্তোলন পর্যন্ত শ্রম ব্যয় প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সেচ ও অন্যান্য খরচ লাগে আরও আট থেকে ১০ হাজার টাকা। এরপর পরিবহণ, বাছাই ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে যোগ হয় আরও পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভালো ফলন হলে এক বিঘায় ৭৫ থেকে ৮৫ মণ পর্যন্ত আলু ওঠে, যা ওজনে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন টনের সমান। বর্তমানে পাইকারি বাজার দর কেজিপ্রতি আট থেকে ১২ টাকা হওয়ায় মোট বিক্রি দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। চাষিরা জানান, প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়ছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা, কিন্তু বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে নয় থেকে ১২ টাকায়। এতে অনেক ক্ষেত্রেই মূলধন ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে, এবং গত বছরের মতো এবারও তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন।

সংরক্ষণ সুবিধা ও কৃষকদের প্রতিক্রিয়া

বগুড়ায় ৫২টি হিমাগারে প্রায় ছয় লাখ টনের বেশি আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ৬০টির বেশি অহিমায়িত মডেল ঘরেও আলু রাখা যায়। তবে বাজার দর কম থাকায় এসব সংরক্ষণ সুবিধা থেকেও কৃষকরা তেমন সুফল পাচ্ছেন না। বগুড়া সদর উপজেলার গোকুল এলাকার কৃষক সিরাজুল হক বলেন, "বীজ, সার, কীটনাশক সব কিছুর দাম বেড়েছে। আলু হিমাগারে রাখতে গেলেও খরচ বেশি। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছি।" শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলার গুজিয়ার কৃষক মিজানুর রহমান যোগ করেন, "ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু দাম নেই। এখন যে দামে বিক্রি করছি, তাতে খরচই উঠছে না। প্রতি কেজিতে ৫-৬ টাকা লোকসান হচ্ছে।"

কৃষি বিভাগের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোহেল মো. সামছুদ্দীন ফিরোজ জানান, আলুর পাশাপাশি ভুট্টা, সরিষা ও অন্যান্য ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, "এতে ঝুঁকি ও খরচ দুটিই কমবে, এবং কৃষকরা আরও টেকসই উপায়ে তাদের আয় বাড়াতে পারবেন।" এই পদক্ষেপ কৃষকদের জন্য বিকল্প পথ খুলে দিতে পারে, বিশেষ করে যখন আলু চাষে লোকসান চলমান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, বগুড়ার আলু চাষিরা বাজারে দাম স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত চাপের মুখে রয়েছেন, এবং স্থানীয় কৃষি নীতিতে দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য।