চার দশক পর পদ্মার বুকে ফিরেছে কৃষির প্রাণ
প্রায় ৪০ বছর পর পদ্মা নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া, চকরাজাপুর, গোকুলপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। বাদাম, বোরো ধান, গম, মটরের খেত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। যেখানে একসময় নদীর গর্জন শোনা যেত, সেখানে এখন কৃষকদের হাসি আর ফসল কাটার ব্যস্ততা।
নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত, এখন ফিরেছে আশার আলো
পাকুড়িয়া গ্রামের কৃষক জহুরুল ইসলামের জীবনযাত্রা এই পরিবর্তনের উজ্জ্বল উদাহরণ। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তিনি ঢাকায় গিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ নিয়েছিলেন। আজ ৪০ বছর পর তাঁর ৫০ বিঘা জমি ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ বিঘায় বাদাম, ১৫ বিঘায় বোরো ধান ও ৫ বিঘায় মটর চাষ করেছেন তিনি। ‘নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ ও নির্বিচারে বালু তোলা বন্ধের সুফল পাচ্ছি,’ বললেন জহুরুল।
জহুরুল ইসলামের মতো হাজারো কৃষকের সংসারে সুদিন ফিরেছে। চকপাকুড়িয়া গ্রামের ইনছার আলী ৪১ বছর পর নিজের ১০ বিঘা জমি ফিরে পেয়ে বোরো ধান লাগিয়েছেন। ‘আবার যদি বালু না কাটে, তাহলে আল্লাহর রহমতে আর দিনমজুরি করে খেতে হবে না,’ বললেন তিনি উচ্ছ্বাস নিয়ে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের সুফল
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২০২১ সালে ‘রাজশাহী জেলার চারঘাট-বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর বাম তীরের স্থাপনাসমূহ নদী ভাঙন হতে রক্ষা প্রকল্প’ হাতে নেয়। ৭৪০ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের আওতায় বাঘা উপজেলার আলাইপুর থেকে চকরাজাপুর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার নদী খনন করা হয়েছে। বাঁ তীরে আটটি আই আকৃতির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। আরও একটি বাঁধ বাঘার চকরাজাপুরে নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত।
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান জানান, ইতিমধ্যে ৩০০ হেক্টর জমি জেগে উঠেছে। এর ৩০ থেকে ৪০ ভাগ জমিতে এবার ফসল হয়েছে। ‘এই প্রকল্পের সুফল মানুষ পেতে শুরু করেছেন,’ বললেন তিনি।
বালু তোলার ভয়ে ‘ঘুমহারাম’ কৃষক
খননকাজের কারণে বন্ধ থাকা বালুমহাল আবারও ইজারা দেওয়ার আলোচনা চলছে প্রশাসনে। এই খবরে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। গোকুলপুর গ্রামের কৃষক ফজল মণ্ডল বললেন, ‘ধরেন এই যে আমরা বাদাম লাগাইছি, গম করিচি, লক্ষ লক্ষ বিঘা। এখন যদি আবার বালু কাটে, তাহলে এই জমি ভাইঙ্গি যাবি। আবার আমরা সেই কষ্টের মধ্যেই পইড়ব।’
গত বুধবার রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে বালুমহাল ইজারা না দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন কৃষকেরা। পাকুড়িয়া গ্রামের চাষি মো. সেলিম আরিফ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময়ে নির্বিচারে বালু তোলার ফলে এই মাঠ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল।’ তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানান, মাঠ পরিদর্শন ও কৃষকদের সঙ্গে কথা না বলে যেন বালুমহাল ইজারার কোনো সিদ্ধান্ত না নেন।
প্রশাসনের অবস্থান
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে বালুমহাল ইজারা দেওয়া বন্ধ ছিল। এখন তাঁদের কাজ শেষ। বালুমহাল ইজারা দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহিনুল হাসান বললেন, কৃষকদের আবেদন পেয়ে সেটা মতামতের জন্য বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছেন। তাঁর মতামত পেলে এর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মনিগ্রাম, পাকুড়িয়া, চকরাজাপুর ও পৌর এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি রক্ষার স্বার্থে চকরাজাপুর ও কিশোরপুর মৌজার বালুমহাল ইজারা বন্দোবস্ত না দেওয়া হোক। তাঁদের আশঙ্কা, বালু তোলা শুরু হলে আবার নদীভাঙন শুরু হবে এবং এলাকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাবেন।
