হালদা রক্ষায় তামাক চাষ ছাড়লেও অর্থকষ্টে মানিকছড়ির কৃষকরা, সহায়তার দাবি
হালদা রক্ষায় তামাক ছাড়া কৃষকদের অর্থকষ্ট, সহায়তার দাবি

হালদা রক্ষায় তামাক চাষ ছাড়লেও অর্থকষ্টে মানিকছড়ির কৃষকরা

দেশে কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী রক্ষায় সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তামাক চাষ ছেড়ে দেওয়া খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার অর্ধশতাধিক কৃষক পরিবার এখন চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বিকল্প হিসেবে শাক-সবজি চাষ করেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না তারা। অনেকেরই ধার করা টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, এমনকি দুবেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘদিনের জীবিকা হারানো

হালদা নদীর উজানে মানিকছড়ি উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার একর চরভূমিতে দীর্ঘদিন ধরে এসব কৃষক তামাক চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বিভিন্ন তামাক কোম্পানি আগাম পুঁজি, বীজ ও উপকরণ দেওয়ায় এটি ছিল তাদের নিশ্চিত আয়ের উত্স। কিন্তু তামাক চাষের রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে গিয়ে জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি হয়ে ওঠায় সরকার নদীতীরে তামাক চাষ নিষিদ্ধ করে। গত বছরের ৫ নভেম্বর প্রকাশিত সংশোধিত গেজেটে নদীর অববাহিকা এলাকায় তামাক চাষে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। অবশ্য কৃষি বিভাগ বলছে, নিষেধাজ্ঞা জারির আগে থেকেই চাষিরা কৃষিবিভাগের পরামর্শে তামাক চাষ ছেড়ে দেয়।

প্রতিশ্রুত সহায়তার অভাব

কৃষকেরা জানান, তামাক ছাড়ার আগে বিকল্প ফসল আবাদে প্রণোদনা ও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই আশায় তারা লাভজনক ফসল ত্যাগ করেন। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। কৃষি বিভাগ থেকে সামান্য বীজ ও সার দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়, অনেক ক্ষেত্রে মৌসুমের শেষ দিকে দেওয়ায় ফলনও ভালো হয়নি। বড়বিল এলাকার কৃষক নাসির উদ্দিন বলেন, "আগে ৫ কানি জমিতে তামাক চাষ করে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় হতো, এখন সেই জমিতে সবজি চাষ করে পুঁজিও ওঠেনি।" ঘোরখানা এলাকার জন্টু মিয়া জানান, তরমুজ, মরিচ ও বেগুন চাষ করেও ফলন ভালো হয়নি। সাহেরা বেগম বলেন, "উৎপাদিত ফসলের দাম এত কম যে খরচই ওঠে না, ফলে চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।"

পরিবহন ও অন্যান্য সমস্যা

পরিবহন ব্যয়ও কৃষকদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানিকছড়ির বাজারে সবজি নিতে প্রায় ৩০০ টাকা ভাড়া লাগলেও বিক্রয়মূল্য অনেক সময় তার চেয়েও কম হয়। এতে কৃষকেরা আরো লোকসানে পড়ছেন। মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে গত বছর সীমিত সংখ্যক কৃষককে ছাগল দেওয়া হলেও অধিকাংশই রোগে মারা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে কৃষকদের ক্ষতি আরো বেড়েছে। তারা এককালীন আর্থিক সহায়তা, উপযোগী বীজ, সার, ওষুধ ও সেচ সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সরকারি প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ মতামত

মানিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আফরোজ ভুঁইয়া বলেন, "তামাক চাষ ছেড়ে আসা চাষিদের বিশেষ কোনো সহযোগিতা প্রদানে সরকারি কোনো বরাদ্দ বা নির্দেশনা নেই। তবুও তাদের জন্য কোনো সহায়তা দেওয়া যায় কি না কৃষি ও মৎস্য বিভাগের সাথে কথা বলব।" হালদা নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণায় যুক্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, "হালদা বাঁচাতে যেসব চাষি তাদের দীর্ঘদিনের লাভজনক তামাক চাষ ছেড়ে দিয়েছে, তাদের এ ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত।"

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) পরিচালক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, "হালদা বাঁচাতে সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে তামাক চাষ ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু তাদের এমন দুর্দশার কথা আমার জানা ছিল না। এ ত্যাগী চাষিদের অবশ্যই সুফলভোগীর তালিকাভুক্ত করা হবে এবং তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রণোদনা প্রদানসহ সকল সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।" তিনি আরো বলেন, "ঈদের পর সরেজমিনে গিয়ে চাষিদের সাথে সরাসরি কথা বলব, তাদের অভাব-অভিযোগ-আবেদন শুনবো।"

হালদা নদীর গুরুত্ব

উল্লেখ্য, হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র নদী, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে মা মাছ ডিম ছাড়ে। প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অমাবস্যা, পূর্ণিমার ছয় তিথি বা জোতে হালদা নদীতে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ কার্প জাতীয় মাছগুলো ডিম ছাড়ে। নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলপ্রবাহ এবং তলদেশের মাটি ডিম ছাড়ার জন্য উপযুক্ত বলে এখানে ডিমের মানও উন্নত। তাই ব্যতিক্রমধর্মী নদীকে মা মাছের ‘মেটারনিটি ক্লিনিক’ বলা হয়। মা মাছ ডিম ছাড়ার মৌসুমে হালদার শাখা নদী ও খাল থেকে এই নদীতে চলে আসে।