ইউটিউব থেকে শিখে কৃষকের অভূতপূর্ব সরিষা সাফল্য
বগরার সাড়িয়াকান্দি উপজেলায় প্রবাস থেকে ফিরে কৃষক সামিউল ইসলাম ইউটিউব থেকে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি শিখে উচ্চফলনশীল সরিষা চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছেন। তার এই সফলতা এলাকার অন্যান্য কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে এবং স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
প্রবাস থেকে ফিরে কৃষিতে নতুন পথ
সামিউল ইসলাম বগরা জেলার সাড়িয়াকান্দি উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের জোড়গাছা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ১৩ বছর প্রবাসে কাটানোর পর দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। দেশে ফিরে তিনি ড্রাগন ফল ও আঙুরের মতো উচ্চমূল্যের ফসল চাষ শুরু করেন। এবার ইউটিউবে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি উচ্চফলনশীল সরিষার জাত বিনা সরিষা-৭৭ (হারিনা) চাষের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমবারের মতো চাষে অভাবনীয় ফলন
সামিউল ইসলাম সাড়িয়াকান্দি উপজেলায় প্রথমবারের মতো ২৬ শতক জমিতে এই উচ্চফলনশীল সরিষা চাষ করেছেন। যদিও তিনি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে চাষ শুরু করেছিলেন, তবুও গাছগুলো ৭ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। প্রতিটি গাছে ১৫ থেকে ২০টি শাখা গজিয়েছে এবং প্রতিটি শাখায় সরিষার গুচ্ছ তৈরি হয়েছে।
সামিউল ইসলাম বলেন, "ইউটিউবে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন ভিডিও দেখে আমি এই উচ্চফলনশীল জাত চাষে আগ্রহী হই। সাধারণত মধ্য অক্টোবরে এই ফসল বপন করা হয়, কিন্তু আমার দেরিতে বপনের কারণে ফলন কিছুটা কম হবে। আদর্শ অবস্থায় প্রতিটি গাছ থেকে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়।"
অর্থনৈতিক সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
২৬ শতক জমিতে সরিষা চাষের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮,০০০ টাকা, অন্যদিকে তিনি ফসল বিক্রি করে প্রায় ৪০,০০০ টাকা আয়ের আশা করছেন। তিনি আশা করছেন, তার জমি থেকে প্রায় ১০ মণ সরিষা উৎপাদন হবে। এই একই জমিতে তিনি আঙুর ও ড্রাগন ফলও চাষ করছেন এবং সেখান থেকে ইতিমধ্যে ভালো মুনাফা অর্জন করেছেন।
চাষ পদ্ধতি ও বিশেষত্ব
এই উচ্চফলনশীল সরিষা জাতটির বিশেষত্ব হলো:
- প্রথাগত পদ্ধতিতে বীজ ছিটিয়ে না দিয়ে সারিবদ্ধভাবে চাষ করতে হয়
- গাছ থেকে গাছের দূরত্ব রাখতে হয় দুই থেকে আড়াই ফুট
- তেলের পরিমাণও বেশি - প্রথাগত সরিষা প্রতি মণে প্রায় ১৫ লিটার তেল দিলেও বিনা সরিষা-৭৭ প্রতি মণে ১৯ লিটার পর্যন্ত তেল দিতে পারে
কৃষি অফিসের প্রতিক্রিয়া ও পরিসংখ্যান
সাড়িয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই মৌসুমে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩,৭৫০ হেক্টর। তবে প্রায় ৩,৩০০ হেক্টর জমিতে চাষ ও সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ৫,৩০০ কিলোগ্রাম সরিষা উৎপাদিত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, "এ অঞ্চলের অনেক বেকার যুবক সফল কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। সামিউল ইসলাম উপজেলায় প্রথম কৃষক যিনি উচ্চফলনশীল বিনা সরিষা-৭৭ জাত চাষ করেছেন। আমরা ইতিমধ্যে তার ক্ষেত পরিদর্শন করেছি এবং ফলন খুবই আশাব্যঞ্জক দেখাচ্ছে।"
তিনি আরও যোগ করেন যে প্রথাগত সরিষা জাত সাধারণত প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৬ মণ ফলন দিলেও এই উন্নত জাতটি ১২ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। এই সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছর উপজেলাজুড়ে এই জাতের চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা
এলাকার কৃষকরা সাধারণত আমন ও বোরো ধানের মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে খালি পড়ে থাকা জমি ব্যবহার করে সরিষা চাষ করে থাকেন। সামিউল ইসলামের এই সাফল্য স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে এবং অনেকেই এখন উচ্চফলনশীল জাত চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই সাফল্য শুধু একটি কৃষকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সম্পূর্ণ এলাকার কৃষি উন্নয়নে নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
