ঝিকরা গ্রামের সুলেখা: দারিদ্র্য জয় করে ফার্মার স্কুলের মাধ্যমে সফল কৃষক ও নারী নেত্রী
ঝিকরা গ্রামের সুলেখা: দারিদ্র্য জয় করে সফল কৃষক

ঝিকরা গ্রামের সুলেখা: দারিদ্র্য জয় করে ফার্মার স্কুলের মাধ্যমে সফল কৃষক ও নারী নেত্রী

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত ঝিকরা গ্রামের মাটি ও মানুষের গল্পটা যেন এক অনন্য সংগ্রামের ইতিহাস। এই গ্রামেরই এক কন্যা সুলেখা খাতুন, যিনি আজ পাশের কয়েকটি গ্রামের শতাধিক নারী কৃষকের জন্য প্রেরণার বাতিঘর। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর বিয়ের পর্ব শেষ করে শুরু হয়েছিল তার সংগ্রামী জীবনের নতুন অধ্যায়। স্বামীর স্বল্প আয়, পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কটু কথার মাঝেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও ট্র্যাজেডি

সুলেখা স্মরণ করেন সেই সময়ের কথা, “বিয়ের সময় আমি পড়াশোনা করছিলাম। স্বামীর স্থায়ী আয় না থাকায় আমাদের পরিবারে আর্থিক অনিশ্চয়তা ছিল। স্বামীর বাড়ির লোকেরা আমাকে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করত।” সংসারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে যখন স্বামী বেকার ছিলেন। স্থানীয় একটি এনজিওতে স্বল্প বেতনের চাকরি নিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। কিন্তু জীবন তাকে আরও কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই পুষ্টির অভাবে শিশুটির মৃত্যু হয়, যা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।

ফার্মার স্কুলের সন্ধান ও পরিবর্তনের শুরু

২০২৩ সালে এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন “ফার্মার স্কুল”-এর কথা। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নে স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় সিনজেনটা বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে দেশের প্রথম এই সমন্বিত শিক্ষা ও সচেতনতা কেন্দ্র। এই স্কুলের মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক কৃষি জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চর্চার মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষমতায়ন করা।

ফার্মার স্কুল থেকে সুলেখা ফসলের পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, সঠিক চাষ পদ্ধতি, বালাই দমন, সার প্রয়োগ কৌশল, মাটির স্বাস্থ্য, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং গবাদিপশু ও মৎস্য ব্যবস্থাপনাসহ আয়বর্ধনমূলক নানা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিনি পান কৃষি ঋণ এবং অভিজ্ঞ মেন্টরদের পরামর্শ

অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প

ফল পেতে দেরি হয়নি। বাড়ির পেছনের ছোট্ট এক টুকরো জমিতে শুরু করা চাষাবাদ আজ প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সাতটি বড় আমবাগান এবং একটি ছোট গরুর খামার। সুলেখা বলেন, “ফার্মার স্কুলে আমি ফসলের পুষ্টি, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, পোকামাকড় দমন ও সার প্রয়োগের সঠিক কৌশল শিখেছি। এই জ্ঞান আমার ফলন বাড়িয়েছে, খরচ কমিয়েছে এবং আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে।”

জাতীয় স্বীকৃতি ও সামাজিক প্রভাব

সুলেখার এই অসামান্য সাফল্য কেবল তার নিজের নয়; তিনি জাতীয় পর্যায়ে ‘জয়িতা’ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি অন্য নারী কৃষকদের পরামর্শ দেন এবং একজন সফল কমিউনিটি লিডার হিসেবে পরিচিত। চারঘাট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “সুলেখা সত্যিই একজন জয়িতা, যিনি দুঃখ, কষ্ট ও দারিদ্র্যকে জয় করেছেন নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে। তিনি এলাকার অন্য নারীদের জন্য একটি উদাহরণ।”

ফার্মার স্কুলের ব্যাপক প্রসার

সিনজেনটা ফার্মার স্কুল কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়; এটি একটি কৃষি ইকোসিস্টেম, যেখানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, দাতা সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একত্রে কৃষকদের পাশে কাজ করছে। মাত্র দুই বছরে প্রায় ১,৫০০ ক্ষুদ্র চাষি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন, যার মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই নারী। এটি দেশের কৃষিতে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতির একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পরিবারের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই ক্ষুদ্র চাষি, যারা দুই একর বা তার কম জমিতে চাষ করেন। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করে। সিনজেনটা বাংলাদেশের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ফার্মার স্কুল ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষক সমাজে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কৃষক-কৃষাণীরা নিয়মিত এখানে এসে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে কৃষি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন।”

সুলেখার স্বপ্ন ও বার্তা

সুলেখা আজ শুধু একজন সফল কৃষক নন; তিনি অন্য নারীদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর। তিনি বলেন, “আমি চাই আমাদের গ্রামের আরও নারীরা কৃষিতে এগিয়ে আসুক। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সাহস থাকলে নারীরাও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।” নিজের এই সাফল্য নিয়ে তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, “আজ আমি শুধু আমার পরিবারকে সহযোগিতা করছি না; একজন স্বাবলম্বী কৃষক হিসেবে সমাজে সম্মানও অর্জন করেছি।”

সুলেখা খাতুনসহ আরও হাজারো গ্রামীণ নারীর পাশে থেকে যেভাবে ‘ফার্মার স্কুল’ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তা কেবল উত্তরবঙ্গ নয়; সারা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের কৃষি খাতে নারীর এই অগ্রযাত্রা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করছে।