চট্টগ্রামের আনোয়ারায় তরমুজ চাষে কৃষকের সাফল্য, লাভের আশা
আনোয়ারায় তরমুজ চাষ: কৃষকের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় তরমুজ চাষে কৃষকের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ফুলতলী গ্রামে তরমুজ চাষে কৃষকদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখা যাচ্ছে। শনিবার সকালে গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, খেতজুড়ে সারি সারি তরমুজ, কোথাও বড় আকারের, কোথাও মাঝারি। কোনো খেতে তরমুজ তোলার কাজ চলছে, আবার কোথাও বিক্রির জন্য জমির পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

তরমুজ চাষের বিস্তারিত তথ্য

গ্রামটিতে প্রায় ২০ জন কৃষক তরমুজ চাষ করেন, সব মিলিয়ে চাষের জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ একর, যা স্থানীয় হিসাবে ১০০ কানি (এক কানি সমান ৪০ শতাংশ)। এসব জমিতে তরমুজ চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা, এবং মৌসুম শেষে বিক্রি করে এক কোটি টাকার বেশি আয় পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

কৃষক মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, "লাভ-ক্ষতি বড় করে দেখি না। বংশপরম্পরায় আমরা তরমুজ চাষ করে আসছি। আমি চার কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছি, এতে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি, চার লাখ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারব।"

চাষের জাত ও রোগের ঝুঁকি

এলাকাটিতে চাষিরা মূলত ৬০ দিনে ফলন হয় এমন ‘বিগ প্লাস’, ‘এশিয়ান প্লাস’ ও ‘গ্লোরিয়া জাম্বু’ জাতের তরমুজ বেশি চাষ করেন। এ ছাড়া ৯০ দিনে ফলন হয় এমন জাতের তরমুজও চাষ হচ্ছে। তবে তরমুজ চাষে নানা রোগের ঝুঁকি রয়েছে, যেমন লতার ডগা শুকিয়ে যাওয়া, ছত্রাকজনিত রোগ, এবং হঠাৎ লতা মরে যাওয়া, যা চাষিরা ‘স্ট্রোক’ বলে থাকেন।

এক কানি জমিতে তরমুজ চাষে খরচ পড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা, এবং বর্তমানে তরমুজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চলতি মৌসুমে আরও প্রায় ২০ দিন বেচাকেনা চলবে বলে জানা গেছে।

অন্যান্য কৃষকের অভিজ্ঞতা

আরেক চাষি মো. মিয়া বলেন, "দেড় কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছি, এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। প্রথম দফায় তরমুজ বিক্রি করেছি ৯০ হাজার টাকার। খেতে এখনো কিছু তরমুজ রয়েছে, সব বিক্রি করলে আরও প্রায় ২০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে।"

কৃষি বিভাগের তথ্য ও উদ্যোগ

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে মোট ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি উৎপাদিত হয়, এর মধ্যে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করেন প্রায় ১৫০ জন কৃষক। এসব তরমুজের মধ্যে ‘গ্লোরি জাম্বু’, ‘গ্লোরি’, ‘সুইট ড্রাগন’, ‘বিগ ফ্যামিলি’, ‘চ্যাম্পিয়ন’, ‘সুপার এমপেরর’, ‘বাংলালিংক’ ও ‘পাকিজা’ জাত রয়েছে।

চলতি বছর ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা উপজেলায় ১২ জন চাষিকে প্রদর্শনী উপকরণ দিয়েছে কৃষি কার্যালয়।

কৃষি কর্মকর্তাদের মন্তব্য

আনোয়ারা উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সরোয়ার আলম বলেন, "আনোয়ারায় প্রতিবছরই তরমুজ চাষ হয়। আমরা নিয়মিত চাষিদের তদারকি করি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকি। চলতি বছর ফুলতলী থেকেই প্রায় এক কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হবে।"

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহমদ সরকার বলেন, "আনোয়ারা উপকূলের তরমুজ স্বাদে ভালো হওয়ায় এর চাহিদাও বেশি। ভবিষ্যতে এখানে তরমুজের চাষ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।"

লোনাপানির প্রভাব

কয়েক বছর ধরে গ্রামটিতে সাগরের লোনাপানি ঢুকে পড়ছে, যার কারণে মাটির উর্বরতা শক্তি কিছুটা কমেছে এবং তরমুজের আকার ছোট হচ্ছে বলে কৃষকরা জানান। তবে ভালো স্বাদের কারণে এই গ্রামে উৎপাদিত তরমুজ ভালো দামে বিক্রি হয়, যা কৃষকদের জন্য আশার আলো হিসেবে কাজ করছে।